উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ): অদম্য মেঘলা।—ছবি মুক্ত প্রভাত
জন্ম থেকেই বাম পা-টি ছোট, চিকন আর অবশ। যে বয়সে সমবয়সীরা দৌড়ে বেড়ায়, সেই বয়স থেকেই মেঘলা খাতুনকে শিখতে হয়েছে এক পায়ে ভারসাম্য রাখার কঠিন লড়াই। কিন্তু শারীরিক এই প্রতিবন্ধকতা তার মনের জোরকে টলাতে পারেনি। এক পায়ে ভর করেই লাফিয়ে লাফিয়ে পথ চলে সে পার করেছে এসএসসির বৈতরণী, এখন স্বপ্ন দেখছে উচ্চশিক্ষার। তবে শারীরিক বাধা ছাপিয়ে এখন তার স্বপ্নের পথে বড় পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবারের চরম দারিদ্র্য।
অদম্য এক যাত্রার গল্প
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার বাঁখুয়া গ্রামের দিনমজুর আমির হোসেনের মেয়ে মেঘলা। বর্তমানে সে উল্লাপাড়া হামিদা পাইলট স্কুল এন্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ৪.৮৩ জিপিএ পেয়ে সে প্রমাণ করেছে, মেধা কোনো শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানে না। কিন্তু বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরের কলেজে এক পায়ে লাফিয়ে যাতায়াত করা তার জন্য ক্রমেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে।
দারিদ্র্যের নির্মম পরিহাস
মেঘলার বাবা আমির হোসেন জানান, দিনমজুরির সামান্য আয়ে চারজনের সংসার চালানোই যেখানে দায়, সেখানে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানো বিলাসিতা মাত্র। অর্থাভাবে বড় ছেলে মেহেদীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে দ্বাদশ শ্রেণিতেই। মেঘলার কলেজে বেতন না লাগলেও যাতায়াতের খরচ দেওয়ার সামর্থ্য নেই বাবার। ফলে নিয়মিত কলেজে যাওয়া হচ্ছে না এই মেধাবী ছাত্রীর, ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনা।
দুচোখে অশ্রু, মনে আশা
কান্নাভেজা চোখে মেঘলা বলে, "আমি উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশের সেবা করতে চাই। শিক্ষকরা আমাকে অনেক সাহায্য করেন, বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিদিন কলেজে যাওয়ার ভাড়াটুকুও আমার বাবার নেই। তবে কি আমার স্বপ্নগুলো মাঝপথেই থেমে যাবে?"
পাশে দাঁড়িয়েছেন শিক্ষকরা
হামিদা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ সিরাজুল ইসলাম মেঘলার সাহসের প্রশংসা করে বলেন, "ও অত্যন্ত মেধাবী। ওর কষ্ট লাঘব করতে আমরা কলেজের ক্লাসগুলো ওপরের তলায় না রেখে নিচতলায় রাখি। ওকে সামাজিকভাবে একটু সহযোগিতা করলে ও অনেক দূর যেতে পারবে।"
আশার আলো
মেঘলার এই সংগ্রামের কথা শুনে তার পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন 'দ্য বার্ড সেফটি হাউজ'-এর চেয়ারম্যান ও পরিবেশকর্মী মামুন বিশ্বাস। তিনি মেঘলার বাড়িতে গিয়ে তার পড়াশোনা অব্যাহত রাখা এবং চলাচলের জন্য একটি ইলেকট্রিক স্কুটিসহ যাবতীয় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষেরা এগিয়ে এলে মেঘলার মতো লড়াকু সৈনিকদের স্বপ্নগুলো হয়তো আর ধূলিসাৎ হবে না। এক পায়ে ভর করেই মেঘলা পৌঁছে যাবে তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে—এমনটাই প্রত্যাশা উল্লাপাড়াবাসীর।
মুক্ত প্রভাত/এসএ