—ছবি মুক্ত প্রভাত
টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হাওর এলাকার শত শত বিঘা পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বোরো মৌসুমের শেষ মুহূর্তে এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিঃস্ব হওয়ার পথে হাজারো কৃষক। শ্রমিকের অভাব আর জলাবদ্ধতায় মাঠের ফসল ঘরে তুলতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন অনেক চাষি।
হাওরজুড়ে হাহাকার
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার মেদীর হাওরসহ চাতলপাড়, গোয়ালনগর, ভলাকুট, কুন্ডা, ফান্দাউক ও গোকর্ণ ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার ধানক্ষেত এখন পানির নিচে। বেশিরভাগ জমির ধান পেকে গেলেও তা কাটার আগেই তলিয়ে গেছে।
মাছমা গ্রামের কৃষক আইন উদ্দিন বলেন, "৬ বিঘা জমি আবাদ করেছিলাম, বৃষ্টির তোড়ে মাত্র ২ বিঘার ধান তুলতে পেরেছি। বাকি সব পানির নিচে। শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না।" একই সুর চাতলপাড়ের কৃষক সোয়াব মিয়া ও আলতাফ হোসেনের কণ্ঠে। তারা জানান, ধার-দেনা করে চাষ করেছিলেন, এখন ঋণের বোঝা কীভাবে শোধ করবেন তা নিয়ে চিন্তায় তাদের ঘুম নেই।
শুকানোর সুযোগ নেই, ধানে গজালো চারা
কৃষকদের আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে রোদের অভাব। যারা কষ্ট করে ধান কেটেছেন, তারা বৃষ্টির কারণে তা শুকাতে পারছেন না। জিরু মিয়া ও মাহফুজ মিয়া জানান, ভেজা ধান স্তূপ করে রাখায় ভেতরেই চারা গজিয়ে যাচ্ছে। এতে ধানের গুণমান নষ্ট হচ্ছে এবং বাজারমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের বক্তব্য
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন জানান, চলতি বছর উপজেলায় ১৭ হাজার ৪৯৬ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, "টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় কৃষকরা বেগ পাচ্ছেন। আমরা কৃষকদের নৌকা দিয়ে হলেও ধান তোলার পরামর্শ দিচ্ছি। তবে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ এখনই বলা সম্ভব নয়।"
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিরিনা নাছরিন পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, "কৃষকরা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ফসল ফলিয়েছিলেন। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও ঢলে তাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। কাটা ধান শুকানোও সম্ভব হচ্ছে না। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।"
সংকটের মূল চিত্র:
আক্রান্ত এলাকা: চাতলপাড়, গোয়ালনগর, ভলাকুট, সদর ইউনিয়নসহ বিস্তীর্ণ হাওর।
প্রধান সংকট: পাহাড়ি ঢল, জলাবদ্ধতা, তীব্র শ্রমিক সংকট এবং ধান শুকানোর জায়গার অভাব।
কৃষকদের দাবি: দ্রুত সরকারি সহযোগিতা এবং কৃষি ঋণের কিস্তি মওকুফ।
নাসিরনগরের হাওরবেষ্টিত এই জনপদে এখন শুধু কৃষকের কান্নার শব্দ। প্রকৃতির এই বৈরিতায় সারা বছরের অন্ন হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।