—ছবি সংগৃহিত
প্যারিস থেকে আনা সুগন্ধি দিয়ে ১৯৫৯ সালে করাচির রাস্তা সুরভিত করার সেই স্মৃতি আজও ম্লান হয়নি। দীর্ঘ সাত দশক পর সেই ইসলামাবাদেই আজ আবার রচিত হচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির নতুন কোনো মহাকাব্য। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আটটা। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ইসলামাবাদের রেড জোনে যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের গাড়িবহর প্রবেশ করছিল, তখন গোটা বিশ্বের নজর পাকিস্তানের দিকে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের এই সরাসরি বৈঠক কেবল একটি আলোচনা নয়, বরং একে দেখা হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় কূটনৈতিক জুয়া হিসেবে। ১০ হাজার নিরাপত্তা সদস্যের প্রহরায় থাকা এই শহরটি আজ যেন এক ‘দুর্ভেদ্য দুর্গ’, যেখানে নির্ধারিত হতে পারে আগামীর বিশ্বশান্তি।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
পাকিস্তানের জন্য এটি কেবল একটি বৈঠক নয়, বরং ওয়াশিংটনের সঙ্গে এক দশকের শীতল সম্পর্ক উষ্ণ করার মোক্ষম সুযোগ। গত দশ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভাইস প্রেসিডেন্ট পাকিস্তান সফরে আসেননি। জেডি ভ্যান্সের এই সফর তাই ১৯৫৯ সালে আইসেনহাওয়ার বা ১৯৬৯ সালে রিচার্ড নিক্সনের সেই ঐতিহাসিক সফরগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ইতিহাস বলছে, সংকটকালে ওয়াশিংটন বরাবরই ইসলামাবাদের শরণাপন্ন হয়েছে। সেই আইসেনহাওয়ারের সময় থেকেই শুরু। তখন পাকিস্তানের কলোনি এলাকার দুর্গন্ধ ঢাকতে প্যারিস থেকে ড্রামভর্তি সুগন্ধি ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিনিময়ে পাকিস্তান পেয়েছিল আস্ত একটি বিমানবাহিনী আর ‘সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রের’ তকমা।
দূতিয়ালিতে পাকিস্তানের পুরোনো দক্ষতা
বৈশ্বিক কোন্দলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা নতুন কিছু নয়। ১৯৭১ সালে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছিল এই পাকিস্তানের হাত ধরেই। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের দূতিয়ালিতেই হেনরি কিসিঞ্জার গোপনে বেইজিং সফর করেছিলেন।
আজকের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটেও পাকিস্তান সেই একই ‘কমন ফ্রেন্ড’ বা সাধারণ বন্ধুর ভূমিকা পালন করছে। ওমান বা কাতারের পর এবারের ভেন্যু হিসেবে ইসলামাবাদকে বেছে নেওয়াটা ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ভরসা পাচ্ছে।
কড়া নিরাপত্তা ও রুদ্ধদ্বার বৈঠক
শনিবার সকাল থেকেই ইসলামাবাদে প্রবেশের সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেকটা ২০০৬ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের সফরের মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সেবার বুশ যখন নিভে যাওয়া আলোয় সামরিক ঘাঁটিতে নেমেছিলেন, নিরাপত্তার কারণে কেউ জানতেই পারেনি তিনি কোন হেলিকপ্টারে আছেন। জেডি ভ্যান্সের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তার এই কড়াকড়ি বলে দিচ্ছে আলোচনার গুরুত্ব কতটা সংবেদনশীল।
কী আছে আলোচনার টেবিলে?
সূত্র বলছে, দুই ঘণ্টার প্রাথমিক আলোচনা শেষে এখন চলছে দ্বিতীয় দফার বৈঠক। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে:
লেবানন পরিস্থিতি: বৈরুতে হামলা বন্ধ এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি তৎপরতা সীমিত রাখা।
ইরানের স্থাবর সম্পদ: তেহরানের জব্দ করা বিশাল অর্থছাড়ের বিনিময়ে পরমাণু কর্মসূচি বা আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপগুলোর বিষয়ে নিশ্চয়তা।
"পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত সেই দেশ, যারা দুই পক্ষেরই বন্ধু হতে পারে"—সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইনস্টন লর্ডের এই উক্তিটিই যেন আজ আবার ইসলামাবাদের আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
তবে অতীতে লিন্ডন জনসনের সেই করাচির উটের গাড়িচালক বশির আহমেদের সঙ্গে বন্ধুত্বের মতো মানবিক সম্পর্ক কিংবা জো বাইডেনের সেই ‘হিলাল-ই-পাকিস্তান’ পদক পাওয়ার মতো উষ্ণতা এবারের বৈঠকেও ফিরে আসবে কি না, তা নির্ভর করছে নৈশভোজ পরবর্তী আলোচনার ফলাফলের ওপর।
আপাতত পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে ইসলামাবাদের বন্ধ দরজার ওপারে কী ঘটছে, তা জানার অপেক্ষায়।