—ছবি মুক্ত প্রভাত
তিন বছর আগের এক শীতে তৃতীয় লীঙ্গের ছোহার (৩০) মৃত্যু হয়। সেসময় স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করতে দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে পরিবারের লোকজন তাকে বাড়ির আঙিনায় কবরস্থ করেন। একই ঘটনা ঘটেছে ওই সম্প্রদায়ের নদী সরকারের পিতার ক্ষেত্রেও। তাকেও কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি।
বড় আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন তৃতীয় লীঙ্গের গুরুমাতা নদী সরকার। তিনি গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের কুমারখালী গ্রামের মৃত আহাদ আলীর সন্তান। গুরুদাসপুর উপজেলা হিজড়া সম্প্রদায়ের গুরুমাতা নদী সরকার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, এতোদিন শেষ ঠিকানা ছিলনা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজের মহানুভবতায় তারা এখন শেষ ঠিকানা পেয়েছেন। হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্যদের কবরস্থ করতে কেনা হয়েছে ৪ শতাংশ জমি।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, কুমারখালী গ্রামের ব্যবসায়ী তৌফিক আলীর কাছ থেকে ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যে ৪ শতাংশের জমিটি কেনা হয়। জমিটি ক্রয় সম্পাদনের জন্য ৫ সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। গ্রহিতা হিসেবে হিজড়াদের পক্ষে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দেখানো হয়েছে। গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুপুরে গুরুমাতা নদী সরকারের হাতে জমির দলিল তুলে দেন গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এই জমি তৃতীয় লীঙ্গের সদস্যদের কবরস্থান হিসেবে ব্যবহার করা হবে। পুরো উপজেলার হিজড়াদের কবরস্থ করা হবে এই কবরস্থানে। জমি ক্রয়ের এই অর্থের যোগান দিয়েছেন ইউএনও।
তৃতীয় লীঙ্গের গুরুদাসপুর উপজেলা কমিটি জানিয়েছে, গুরুদাসপুরে হিজড়া সম্প্রদায়ের ৪৫জন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে ২১ জনই রয়েছেন কুমারখালী গ্রামে। তাদের স্থায়ী কোনো কর্ম নেই। নেই নির্ভরযোগ্য আবাসও। সব ছাপিয়ে নিজেদের নামে স্থায়ী কবরস্থান হয়েছে। ইতিমধ্যে তারা কবরস্থানের জায়গাটি বুঝে নিয়েছেন ক্রেতার কাছ থেকে। এখন থেকে চিরনিদ্রা হবে নিজেদের মাটিতে। লাশ দাফনে আর কেউ বাধা দিতে পারবেন না ভেবে ভালো লাগছে।
তৃতীয় লীঙ্গের নুপুর, সোনালী, সৌখীন, মাধবী, ইতি ও দিপা বলেন, স্থানীয় লোকজন তাদের কটূকথা বলেন। হিজড়া হয়ে জন্মানো তো তাদের অপরাধ নয়। কিন্তু লোকজন তাদের সমাজ থেকে পৃথক করে রেখেছে। নানা প্রয়োজনে অনেকেই ব্যবহার করেন। কিন্তু কেউ পাশে দাঁড়াতে চাননা।
তারা বলেন, এখানে ওখানে কোনো মতে মাথা গুঁজলেও মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় বিপত্বি ঘটে। গ্রামের কবরস্থানে হিজড়া সম্প্রদায়ের কাউকে দাফন করতে দেওয়া হয়না। হিজড়ার পিতা বলে আহাদ আলীকেও কবরস্থান কমিটির লোকজন স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করতে দেননি। বিষয়টি নিয়ে উপজেলার এক সভায় নিজেদের শেষ ঠিকানার কথা তুলে ধরেন নদী সরকার। এরপর থেকে শুরু হয় কবরস্থান কেনার কার্যক্রম। অবশেষে ইউএনও’র হস্তক্ষেপে কবরস্থানের জন্য মাটি কেনা হয়েছে। এখন নিজেদের মাটিতে তাদের কবরস্থ করা হবে ভেবে তারা আনন্দিত-উচ্ছ্বাসিত।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, মৃত্যুর পর তৃতীয় লীঙ্গের সদস্যদের সামাজিক কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয় না। বিষয়টি জেনে তিনি ব্যথিত হয়েছেন। অন্তত নিজেদের মাটিতে যেন তৃতীয় লীঙ্গের সদস্যদের কবর হয়, সেই ব্যবস্থা তিনি করেছেন। এছাড়া এই সম্প্রদায়ের সদস্যদের পুনর্বাসনসহ নানা ধরণের পরিকল্পনাও রয়েছে তার।