—ছবি সংগৃহিত
জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান ও প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের দাবিতে জাতীয় সংসদে উত্তপ্ত আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। আজ রোববার বিকেলে সংসদের অধিবেশনে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর দেওয়া একটি নোটিশকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে এই অনির্ধারিত বিতর্ক হয়।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, এই সংসদের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ' হিসেবেও কাজ করার কথা। তবে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই পরিষদের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। এই অচলাবস্থা নিরসনেই আজ সংসদে আলোচনার দাবি তোলে বিরোধী দল।
বিতর্কের সূত্রপাত
বিকেলে স্পিকারের আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হওয়ার পরপরই পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়ান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, গত ১৫ মার্চ স্পিকারের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার বিষয়ে একটি বিধিবদ্ধ নোটিশ জমা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, জুলাই জাতীয় সনদের ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা এই সংসদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। তাই জনগুরুত্বপূর্ণ এই নোটিশটির ওপর এখনই আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন।
তবে সরকারি দলের পক্ষ থেকে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম এই দাবির বিরোধিতা করে বলেন, সংসদের একটি নির্ধারিত কার্যসূচি রয়েছে। প্রশ্নোত্তর পর্ব ও বিধি-৭১-এর আওতায় জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের আলোচনা শেষ হওয়ার আগে অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনার সুযোগ নেই।
সংসদীয় রীতি বনাম জনগুরুত্ব
বিতর্কে অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, "বিরোধী দল যে প্রস্তাব এনেছে, সরকার তার ওপর বিধি মোতাবেক আলোচনা করতে আগ্রহী। তবে সংসদীয় রীতি ভেঙে মাঝপথে কোনো বিষয় আনা ঠিক হবে না। নিয়ম অনুযায়ী ৭১ বিধির আলোচনার পরেই মুলতবি বা অন্যান্য প্রস্তাব আসতে পারে।"
পাল্টা যুক্তিতে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "এই সংসদ কীভাবে গঠিত হয়েছে, তা কি সবাই ভুলে যাচ্ছে? নির্বাচনের পাশাপাশি একটি গণভোটও হয়েছিল। কিন্তু এখনকার কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে সেই গণভোট বা জুলাই সনদের কোনো অস্তিত্বই নেই। এর চেয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর কী হতে পারে? নিয়মিত কাজের চেয়ে আগে এই সংকটের সুরাহা হওয়া উচিত।"
ডেপুটি স্পিকারের রুলিং
উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি যুক্তির পর সভাপতি ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল পরিস্থিতি শান্ত করেন। তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের আশ্বস্ত করে বলেন, "আমি আপনাদের দেওয়া নোটিশটি পেয়েছি। সংসদের কার্যবিধি অনুযায়ী বিধি-৭১-এর আলোচনা শেষ হওয়ার পর আমি এই নোটিশের ওপর সিদ্ধান্ত দেব।"
প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। গণভোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল—একটি সাধারণ সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যরা দ্বৈত শপথ নিলেও বিএনপি সদস্যরা দ্বিতীয় শপথটি নেননি। ফলে আইনি জটিলতায় আটকা পড়েছে সংবিধান সংস্কারের মূল প্রক্রিয়া।