—ছবি মুক্ত প্রভাত
বসন্তের বাতাস আর চলনবিলের অবারিত ফসলের মাঠের মাঝে বসেছে শতাব্দী প্রাচীন এক মিলনমেলা। নাটোরের সিংড়ায় হযরত ঘাসী দেওয়ান (রহ.)-এর মাজার চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘তিসিখালি মেলা’। গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব শুক্রবার দিনব্যাপী হাজারো মানুষের সমাগমে মুখর ছিল।
পঞ্জিকা অনুসারে প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সিংড়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পূর্বে তিসিখালি গ্রামে পীর ঘাসী দেওয়ান (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে এই উৎসবের শুরু। কালক্রমে এটি কেবল ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে চলনবিল অঞ্চলের অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষের প্রধান উৎসবে পরিণত হয়েছে।
মেলা ঘিরে নাইওর: গ্রামের ঘরে ঘরে উৎসব
এলাকার প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিসিখালি মেলাকে কেন্দ্র করে ডাহিয়া, হিজলী, মাগুড়া, তাজপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে ঈদের মতো আনন্দ বিরাজ করে। এই মেলা উপলক্ষে বিবাহিত মেয়েরা বাপের বাড়ি ‘নাইওর’ আসেন। জামাইদের আপ্যায়ন আর নতুন পোশাকে উৎসবের রঙ ছড়িয়ে পড়ে ঘরে ঘরে।
মেলায় আসা দর্শনার্থী রাজু আহমেদ বলেন, ‘প্রতি বছরই এই মেলার জন্য অপেক্ষায় থাকি। এবারও ছেলের জন্য খেলনা কিনেছি, মেলায় অনেক আনন্দ হলো।’ সিংড়া পৌর এলাকা থেকে আসা সারোয়ার ও রবিন জানান, মেলার পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবার বেশ ভালো ছিল।
মাঠে প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবক
মেলার বিশাল এলাকাজুড়ে বসেছে গ্রামীণ কুটির শিল্প, মাটির তৈরি তৈজসপত্র, কাঠের আসবাব ও মিষ্টির দোকান। লোকজ সংস্কৃতির এই সমাগমে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে তৎপর ছিল প্রশাসন।
সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মাজার কমিটির সভাপতি আব্দুল্লাহ আল রিফাত বলেন, ‘মেলা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে উপজেলা প্রশাসনের একটি বিশেষ কমিটি মাঠে কাজ করেছে। পুলিশ, গ্রাম পুলিশ ও আনসার সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। মেলার পবিত্রতা রক্ষা ও সব ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে ছিল।’
চলনবিলের বুক চিরে বয়ে চলা খালের পাড়ে এই মেলা যেন দুই দিনের জন্য আধুনিক যান্ত্রিকতা ভুলিয়ে মানুষকে শেকড়ের টানে ফিরিয়ে আনে। শুক্রবার সন্ধ্যায় মেলার সমাপ্তি ঘটলেও মানুষের মনে আগামী বছরের জন্য অপেক্ষার প্রদীপ জ্বলে রইল।