—ছবি সংগৃহিত
ঈদের দিন সন্ধ্যায় মহা ধুমধামে কনের গায়েহলুদ সম্পন্ন হয়েছে। রোববার সকালে বরের গায়েহলুদের কথা ছিল। সেই অনুষ্ঠানের জন্য বর নিজেই গাড়ি চালিয়ে দুধ আনতে যাচ্ছিলেন। পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাইভেটকারটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ট্রাকে লেগে দুমড়েমুচড়ে যায়।
এতে ঘটনাস্থলেই বরের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর খবর এলে দুই পরিবারের বিয়ের আনন্দ শোকের মাতমে পরিণত হয়। কনের নাম অন্তরা খাতুন। তিনি বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়া শেষে সেখানেই ইন্টার্নশিপ করছেন। তাঁর বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চণ্ডীপুর বড় ছয়ঘটি গ্রামে। বর প্রকৌশলী জুলফিকার ইসলাম জিল্লুর রহমানের সঙ্গে কনে অন্তরার বিয়ের দিন আজ সোমবার। বর জুলফিকার পাবনার ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া নওদাপাড়া গ্রামের আনসারুল মুন্সির ছোট ছেলে।
কনের পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, অন্তরা খাতুনের পিতা ২২ বছর আগেই দুরারোগ্য ব্যধিতে মারা গেছেন। সেই থেকে মা রওশন আরা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ শুরু করেন। একমাত্র ভাই সোহেল রানা রাজমিস্ত্রির কাজ করে ছোট বোনকে লেখাপড়া করান। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে অন্তরা সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান। সেসময় র্যাব-৫ এর অধিনায়কের পক্ষ থেকে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মারুফ হোসেন খান অন্তরাকে মেডিকেলে ভর্তির টাকা দেন। সেই সহায়তাতেই মেডিকেলে ভর্তি হয়ে এমবিবিএস শেষ করে বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করছেন। গতকাল রোববার সকালে ছিল বরের গায়েহলুদের কথা। বর জুলফিকার দাশুড়িয়া থেকে অনুষ্ঠানের ক্ষীর রান্নার দুধ আনতে নিজেই গাড়ি চালিয়ে নাটোরে যাচ্ছিলেন। রোববার সকাল আটটায় নাটোর হাইওয়ের বড়াইগ্রামের বনপাড়া গড়মাটি কলোনি সড়কে তাঁর প্রাইভেট কারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পাশে দাঁড়ানো ট্রাকে লেগে দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
এর আগে শনিবার রাতেই কনে অন্তরার গায়েহলুদে বরপক্ষের লোকজন উপস্থিত ছিলেন। অন্তরা মিষ্টিমুখও করিয়েছেন। রোববার সকালে কনের বাড়ির লোকজনও বরের গায়েহলুদে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। চণ্ডীপুর বড় ছয়ঘটি গ্রামে কনে অন্তরার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অন্তরাদের বাড়িতে তালা ঝুলছে। বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য সাজানো প্যান্ডেল ভেঙে নিচ্ছেন ডেকোরেটরের লোকজন।
বন্ধন ডেকোরেটরের মালিক হৃদয় আহমেদ বলেন, বিয়ের ধুমধাম শুরু হয়েছিল ঈদের আগেই। তারা ঈদের দিন থেকেই প্যান্ডেল সাজিয়ে ছিলেন। ওই প্যান্ডেলে বসেই কনের গায়েহলুদ সম্পন্ন হয়েছে। সেখানেই কনেকে ক্ষীর মুখে দেওয়া হয়। কিন্তু রোববার সকালে বরের মৃত্যু খবর পাওয়ার পর সবাই বরের বাড়িতে চলে গেছেন। বরের মৃত্যুর পর বিয়ের প্যান্ডেল দেখে সবাই ডুকরে কাঁদছিলেন। কেউ সহ্য করতে পারছিলেন না। তাই তিনি প্যান্ডেল ভেঙে সরিয়ে নিচ্ছেন।
প্যান্ডেলের পাশে দাঁড়িয়ে অন্তার চাচি রোজিনা বেগম চোখের জল ফেলছিলেন। তিনি বলেন, মেয়ের মুখে ক্ষীর দেওয়ার পর বৃষ্টি শুরু হয়। একারণে রোববার সকালে বরের মুখে ক্ষীর দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকাল আটটার দিকেই বরের মৃত্যুর খবর চলে আসে। মুহুর্তেই সব আনন্দ বিষাদে রূপ নেয়। খবর ছড়িয়ে পড়লে দিনভর গ্রামের মানুষ অন্তরাদের বাড়িতে জড়ো হয়ছিলেন। মানুষজন অন্তরার জন্য আফসোস করছিলেন।
প্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন অন্তরার ভাইয়ের শ্বশুড়ি সালাম বেগম। তিনি বলেন, ‘একটা দুর্ঘটনা বিয়ের উৎসব মাটি করে দিল। নিয়ে নিল বরের প্রাণ। আমরা কেউ এই ঘটনা কল্পনাও করতে পারিনি। মেয়েটার কপালে বোধ হয় এই লেখা ছিল।’
বাইরের সরগোল সুনে অন্তরার চাচা আবদুর রহিম বেড়িয়ে এলেন ঠিকই, কিন্তু কোনো কথা বলতে পারলেন না। তিনিও ফুপিয়ে কাঁদছিলেন।
বনপাড়া হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, সোমবার নিহত প্রকৌশলীর বিয়ের কথা ছিল। বিয়ের আগের দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিষয়টি খুবই বেদনাদায়ক। আইনি প্রক্রিয়া মেনে নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।