—ছবি সংগৃহিত
কুমিল্লার পদুয়াবাজার রেলক্রসিংয়ে গত শনিবার দিবাগত রাতে যাত্রীবাহী বাসে ট্রেনের ধাক্কায় ১২ জন নিহতের ঘটনায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের চিরচেনা পথেই হাঁটছে। দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে গেটম্যানদের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে দুজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্টেশনমাস্টারের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে গত আট বছরে রেলের পূর্বাঞ্চলে হওয়া বড় আটটি দুর্ঘটনার নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবারই তদন্তের খড়্গ নেমে আসে কেবল গেটম্যান, চালক বা গার্ডদের ওপর। রেলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়ায় এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তি পাচ্ছে না সাধারণ যাত্রী।
পদুয়াবাজারের সেই অভিশপ্ত রাত
শনিবার দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিট। পদুয়াবাজার রেলক্রসিংয়ে সিগন্যাল বার না নামানো থাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস লাইনের ওপর উঠে পড়ে। মুহূর্তেই দ্রুগামী ট্রেনের ধাক্কায় বাসটি দুমড়েমুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ১২ জন। আহত অন্তত ১০ জন এখনো হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, "প্রাথমিক তদন্তে গেটম্যানের গাফিলতি স্পষ্ট। বিস্তারিত জানতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।"
আট বছরে আট দুর্ঘটনা: প্রাণ গেল ৬৭ জনের
রেলওয়ের তথ্য-উপাত্ত বলছে, গত আট বছরে কেবল পূর্বাঞ্চলেই আটটি বড় দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৬৭ জনের। আহত হয়েছেন ২১৮ জনের বেশি। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর ভৈরবে মালবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে ১৯ জন এবং ২০১৯ সালে কসবায় উদয়ন ও তূর্ণা নিশিথার সংঘর্ষে ১৬ জনের মৃত্যু আজও মানুষকে আতঙ্কিত করে। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন বলছে—হয় চালক সিগন্যাল দেখেননি, না হয় গেটম্যান ঘুমে ছিলেন। কিন্তু কেন একজন গেটম্যান বা চালক মাসের পর মাস বেতন না পেয়েও কাজ করে যাচ্ছেন, কেন আধুনিক স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না—সেই প্রশ্নগুলো বরাবরই ধামাচাপা পড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন: দায় কার?
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. সামছুল হক এই তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, "রেলের তদন্ত কমিটি মানেই হলো নিজেদের লোক দিয়ে নিজেদের বাঁচানো। গেটম্যানদের বরখাস্ত করাটা কেবল লোক দেখানো ব্যবস্থা। যত দিন পর্যন্ত উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে না, তত দিন এ ধরনের মৃত্যু মিছিল থামবে না।"
তিনি আরও যোগ করেন, "অন্যান্য দেশে এমন প্রাণহানির পর শীর্ষ কর্মকর্তারা নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেন। আমাদের এখানে ঠিক উল্টোটা ঘটে। এখানে দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার দায় ছোট কর্মচারীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ওপরতলার লোকজন নিরাপদে থাকেন।"
রাজনীতির মারপ্যাঁচে নিরাপত্তা
রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দুর্ঘটনা রোধে আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আগের আমলের অব্যবস্থাপনাকেও দায়ী করেছেন। রাজনৈতিক এই দোষারোপের সংস্কৃতিতে সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।
সমাপ্তিহীন ট্র্যাজেডি
২০১৮ সালের বারইয়ারহাট, ২০২১ সালের ঝাউতলা কিংবা ২০২৫ সালের কালুরঘাট—প্রতিটি দুর্ঘটনাস্থলে স্বজনহারাদের আহাজারি একই রকম। তদন্ত কমিটি গঠন হয়, নিচুতলার কেউ বরখাস্ত হয়, কিছু দিন পর সব আবার আগের মতোই চলতে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল নিয়োগের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে রেল ভ্রমণ কোনোভাবেই নিরাপদ হবে না।