—ছবি সংগৃহিত
লোনাপানির বন্দিশালা থেকে বৃষ্টির ‘জীবনরেখা’: উপকূলের নারীদের নীরব বিপ্লব
বিশেষ প্রতিবেদক | উপকূলীয় অঞ্চল থেকে
খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের আম্বিয়া খাতুনের কাছে একসময় ‘ভোর’ মানেই ছিল এক কলস পানির জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম। ২-৩ ঘণ্টা তপ্ত রোদে হেঁটে দূরে কোনো মিষ্টি পানির উৎস খুঁজে পাওয়া ছিল তাঁর প্রতিদিনের ভাগ্যপরীক্ষা। অনেক সময় পানির অভাবে উনুনে হাঁড়ি চড়ত না। এই লবণাক্ততা কেবল তাঁর তেষ্টাই বাড়াত না, কেড়ে নিয়েছিল শারীরিক সুস্থতা আর মানসিক শান্তিও।
কিন্তু আম্বিয়ার সেই লোনাপানির বন্দিজীবন এখন অতীত। এখন তাঁর বাড়ির আঙিনায় শোভা পাচ্ছে দুই হাজার লিটারের এক বিশাল নীল রঙের পানির আধার। এটি কেবল একটি আধার নয়, বরং উপকূলের শত শত নারীর জন্য এক ‘জীবনরেখা’। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে সারা বছরের সুপেয় পানির নিশ্চয়তা পাওয়ায় বদলে গেছে তাঁদের জীবনচিত্র।
পানির পেছনে ছোটা সময় এখন দিচ্ছে ফসল
আগে যে ২-৩ ঘণ্টা সময় পানি সংগ্রহে ব্যয় হতো, এখন সেই সময়টি আম্বিয়া ও পূর্ণিমা রানীদের জন্য আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। জিসিএ (GCA) প্রকল্পের সহায়তায় তাঁরা এখন বাড়ির উঠানেই সবজি চাষ করছেন।
হাইড্রোপনিক চাষ: যেখানে মাটি নেই বা লবণাক্ততা বেশি, সেখানে মাটি ছাড়াই সবজি ফলানো হচ্ছে।
অ্যাকুয়াজিওপনিক: একই সাথে মাছ ও সবজি চাষের আধুনিক প্রযুক্তি।
সাতক্ষীরার আশাশুনির বিধবা পূর্ণিমা রানী বলেন, "আগে ২ কিলোমিটার হেঁটে পানি আনতাম। এখন নিজের উঠানেই নিরাপদ পানি পাই, সবজি ফলাই। মনে হয় জীবনের অর্ধেক বোঝা নেমে গেছে।"
গবেষণায় উঠে আসা ভয়াবহ চিত্র
উপকূলীয় নারীদের এই কষ্টের পেছনে ছিল এক নিষ্ঠুর পরিসংখ্যান। গবেষকদের মতে:
উপকূলের ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন নারী ও কিশোরীরা।
দূর থেকে পানি সংগ্রহের কারণে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি ৯৩.৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
বছরে গড়ে প্রায় ৫ মাস নিরাপদ পানি পাওয়াই যায় না এই অঞ্চলে।
বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনে বিশেষ সম্মাননা
ইউএনডিপি (UNDP) ও এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ-এর এই সমন্বিত উদ্যোগ কেবল গ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, পৌঁছে গেছে বৈশ্বিক দরবারেও। ২০২৫ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে ২০টি বিশেষ উদ্যোগের মধ্যে এই জিসিএ প্রকল্পটি 'লোকাল অ্যাডাপটেশন চ্যাম্পিয়নস অ্যাওয়ার্ড' অর্জন করেছে।
খুলনার মাকসুদা খাতুন, যিনি নিজেকে একজন ‘সিঙ্গেল মা’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে একসময় হতাশায় ডুবেছিলেন, আজ তিনি ‘গোলাপ’ নামের এক নারী দলের নেত্রী। মাকসুদা বলেন, "নিরাপদ পানি আর এই প্রশিক্ষণ আমাকে আত্মবিশ্বাসী করেছে। এখন আমি জানি, প্রতিকূলতাকে জয় করে বেঁচে থাকা সম্ভব।"
এক নজরে পরিবর্তনের চিত্র:
| সূচক | আগে | এখন (জিসিএ প্রকল্পের পর) |
| পানি সংগ্রহে ব্যয় | প্রতিদিন ২-৩ ঘণ্টা | ০ ঘণ্টা (বাড়ির উঠানেই লভ্য) |
| স্বাস্থ্য ঝুঁকি | ৯৩.৩% প্রজনন সমস্যা | ঝুঁকি হ্রাস ও সুস্থতা বৃদ্ধি |
| আয়ের উৎস | ছিল না | সবজি, মাছ ও কাঁকড়া চাষ |
| স্বীকৃতি | অবহেলিত উপকূলবাসী | বৈশ্বিক চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড |
উপকূলের লোনা মটিতে এখন নতুন আশার বীজ বুনছেন এই নারীরা। বৃষ্টির জল আর আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তাঁরা প্রমাণ করেছেন—সংগ্রাম যখন অস্তিত্বের, তখন বিজয়ই একমাত্র গন্তব্য।