—ছবি সংগৃহিত
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করায় টালমাটাল হয়ে পড়েছে বিশ্ববাজার। পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন এক ভয়াবহ সংকটের মুখে। বিশেষ করে দেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রধান উৎস কাতারের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং গৃহস্থালি খাতে। ইতোমধ্যে এলএনজি সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আসন্ন গ্রীষ্মে দেশে বড় ধরনের লোডশেডিং ও শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কাতারের সংকট ও বাংলাদেশের ঝুঁকি
বাংলাদেশের এলএনজি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশের উৎস কাতার। সম্প্রতি ইরানের হামলায় কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির এলএনজি স্থাপনা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতার এনার্জির তথ্যমতে, এই ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগতে পারে।
বর্তমানে দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যার একটি বড় অংশ আসত আমদানি করা এলএনজি থেকে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় কাতার থেকে এলএনজি পরিবাহী ট্যাংকারগুলো পারস্য উপসাগরেই আটকে আছে। এতে মে মাস থেকে দেশে গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
"জ্বালানি তেল বেশি আসে সিঙ্গাপুর থেকে। তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকেই অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে। তাই সরবরাহ ব্যাহত হতেই পারে। এলএনজি পেতেও সমস্যা হবে। সাশ্রয় করে ব্যবহার কমাতেই হবে।"
— ম তামিম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী।
জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা
গ্যাসের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের বাজারেও আগুন লেগেছে। বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল মাত্র ৬৫ ডলার। ডিজেলের দাম ১৪০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বিপিসি সূত্র জানায়, দেশে ব্যবহৃত ডিজেলের সিংহভাগই আমদানিনির্ভর। যদিও বর্তমানে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত মজুত আছে, তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ শৃঙ্খল পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। বিশেষ করে উড়োজাহাজের জ্বালানি (জেট ফুয়েল) এবং অকটেন আমদানিতে ইতোমধ্যে জটিলতা শুরু হয়েছে।
বিকল্প খুঁজছে পেট্রোবাংলা
সংকট মোকাবিলায় পেট্রোবাংলা এখন মধ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে এলএনজি আমদানির চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আনতে গেলে খরচ ও পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সরকারকে সাশ্রয়ী হওয়ার কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সম্ভাব্য পদক্ষেপ:
অফিসের সময়সূচি কমিয়ে আনা।
পরিকল্পিত লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়।
বিকল্প দেশগুলো থেকে দ্রুত জ্বালানি আমদানির চুক্তি।
২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতার চেয়েও এবারের সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।