—ছবি সংগৃহীত
রাজধানীর আসাদ গেট এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনে গত দুই ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন মোটরসাইকেল চালক বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুল হাসান। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর যখন পাম্পের কাছে পৌঁছালেন, তখন জানানো হলো—২০০ টাকার বেশি অকটেন দেওয়া যাবে না। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘রেশনিং তুলে দেওয়ার কথা শুনলাম, কিন্তু পাম্পে এসে তো উল্টো চিত্র দেখছি। তেল পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যুদ্ধ করতে হচ্ছে।’
কামরুল হাসানের মতো এমন অভিজ্ঞতা এখন ঢাকার প্রায় সব যানবাহন চালকের। দুই সপ্তাহ ধরে রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোয় জ্বালানি তেলের জন্য গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। সরকার গত রোববার রেশনিং বা সরবরাহের সীমা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি। উল্টো ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্ক থেকে তেল কেনার হিড়িক পড়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ গত বছরের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তবুও ফিলিং স্টেশনগুলোয় তেল পৌঁছামাত্রই তা শেষ হয়ে যাচ্ছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় দেশে তেলের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়।
রেশনিং বনাম চাহিদা
বিপিসির পরিসংখ্যান বলছে, গত রোববার ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১৬ হাজার ১৬৪ টন, যেখানে স্বাভাবিক চাহিদা ১২ হাজার টনের কাছাকাছি। পরদিন সোমবার তা আরও বেড়ে ১৭ হাজার ৫৯৮ টনে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়িতে ব্যবহৃত অকটেন ও পেট্রলের চাহিদাও কয়েক গুণ বেড়েছে। গত সোমবার এক দিনেই ২ হাজার ৩৪৯ টন অকটেন বিক্রি হয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম তামিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘রেশনিং তোলার পরও মজুত নিয়ে মানুষের আস্থা বাড়েনি। এখনো অনেকে ভীতি থেকে তেল কিনছে। তাই আবারও রেশনিং শুরু করা উচিত। জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবহার কমাতেই হবে।’
ফিলিং স্টেশনের চিত্র
গতকাল মঙ্গলবার থেকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের সাত দিনের ছুটি শুরু হয়েছে। ছুটির প্রথম দিনেও মগবাজার, বিজয় সরণি ও মতিঝিল এলাকার ১০টি পাম্প ঘুরে দেখা গেছে যানবাহনের উপচে পড়া ভিড়। কোথাও তেল নেই বলে পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে, আবার কোথাও নির্দিষ্ট সীমার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না।
রাজারবাগ ফিলিং স্টেশনের এক কর্মচারী জানান, ডিপো থেকে সরবরাহে কড়াকড়ি থাকায় তারা চাইলেও গ্রাহককে চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে পারছেন না। অন্যদিকে, মতিঝিলের নাভানা পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, দুপুরের আগেই তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বিপিসির নতুন নির্দেশনা
সংকট মোকাবিলায় বিপিসি গত রোববার একটি অফিস আদেশ জারি করেছে। সেখানে ১৫ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত দৈনিক তেলের সরবরাহ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ১৬ থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে ১৪ হাজার ৫৫ টন। তবে ১৯ থেকে ২২ মার্চ পর্যন্ত ন্যূনতম প্রয়োজনমাফিক তেল সরবরাহ করা হবে এবং ঈদের দিন ও পরদিন ডিপো পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে পরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি জাহাজভাড়া ও বিমা খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ফলে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিলেও সরবরাহকারী পেতে বিলম্ব হচ্ছে। এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।