—ছবি সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এক নতুন সমীকরণ দৃশ্যমান হচ্ছে। প্রায় ১৮ মাস রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা থাকার পর এবং গত ৯ মাস নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও, সারা দেশে আওয়ামী লীগের এক ডজনের বেশি কার্যালয়ের তালা খোলা হয়েছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এটি মূলত বর্তমান সরকারের মনোভাব বোঝার একটি ‘টেস্ট কেস’। দলটির লক্ষ্য—মাঠে সীমিত উপস্থিতি বজায় রাখা এবং কারাবন্দী নেতাদের মুক্তির পথ সুগম করা।
কার্যালয় খোলার প্রতীকী প্রচেষ্টা ও সভাপতির নির্দেশ
গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলোতে দীর্ঘ বিরতির পর প্রাণসঞ্চারের চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতে অবস্থানরত দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা দেশের নেতা-কর্মীদের ধীরে ধীরে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এরই অংশ হিসেবে গত দুই সপ্তাহে ১২টির বেশি জেলা ও মহানগর কার্যালয় এবং বেশ কিছু উপজেলা কার্যালয় খোলা হয়েছে। গত শুক্রবার ধানমন্ডিতে সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে স্লোগান দিয়েছেন যুব মহিলা লীগের নেত্রীরা। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর ও নোয়াখালীর মাইজদীতেও একই চিত্র দেখা গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের নেতাদের মাধ্যমে এই কার্যক্রম চালিয়ে আওয়ামী লীগ মূলত জনমনে ও প্রশাসনে তাদের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করছে।
বিএনপির ‘সবুজ সংকেত’ ও নমনীয়তা?
আওয়ামী লীগের কিছু নেতার দাবি, স্থানীয় পর্যায়ে কোথাও কোথাও বিএনপির নেতাদের পরোক্ষ সহায়তা বা ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়া যাচ্ছে। পঞ্চগড়ের চাকলাহাটে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার উপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে দেওয়ার ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আওয়ামী লীগের একটি অংশ মনে করছে, অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় নির্বাচিত বিএনপি সরকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় কিছুটা নমনীয় হতে পারে। দলটির ধারণা, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি বড় অংশ ভোট দিয়েছে এবং কোনো প্রতিহত কর্মসূচি না দেওয়ায় বিএনপি সরকারের কাছ থেকে তারা কিছুটা ‘প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য’ স্বস্তি পেতে পারে।
তবে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, “এটা আমরা চাইনি এবং যেহেতু আইনগতভাবে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেভাবেই এটাকে দেখা হবে।”
জামিনে মুক্তির অপেক্ষায় প্রাণসঞ্চার
আওয়ামী লীগের পরবর্তী কৌশল নির্ভর করছে কারাবন্দী নেতাদের মুক্তির ওপর। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ের দবিরুল ইসলাম এবং বরিশালের জেবুন্নেছা আফরোজ ও তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসের জামিন প্রাপ্তি দলটির তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।
ভারতের অবস্থানরত এক নেতা টেলিফোনে জানান, বড় নেতারা এখনই ছাড়া না পেলেও মধ্যম ও নিম্ন সারির নেতারা জামিন পেলে দলে প্রাণসঞ্চার হবে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ফোরাম ও প্রভাবশালী দেশগুলোর সহায়তা পাওয়ার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে দলটি।
বিশ্লেষকের পর্যবেক্ষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, আওয়ামী লীগের একটি স্থায়ী সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে এবং তারা নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে। ফলে জয়ী প্রার্থীদের কাছ থেকে কিছুটা সহানুভূতি প্রত্যাশা করা অস্বাভাবিক নয়। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন:
“বিদেশে বসে রাজনীতি করা কঠিন। আওয়ামী লীগকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে হলে দেশে কার্যকর নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে এবং বর্তমানে যারা রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে আছেন, তাদের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতায় আসতে হবে।”
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি
আওয়ামী লীগের এই সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে খোদ দলের ভেতরেই মতভেদ আছে। অতিদ্রুত সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলে বিএনপি রাজনৈতিক চাপে পড়তে পারে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে সরকার ও বিএনপি—উভয়ই আওয়ামী লীগের প্রতি কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হতে পারে।
বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ প্রধান তিনটি কার্যালয় পরিত্যক্ত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় রয়েছে। নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এই আইনি বাধা কাটিয়ে দলটি কতটা সামনে এগোতে পারবে, তা নির্ভর করছে সামনের দিনগুলোতে সরকারের চূড়ান্ত পদক্ষেপের ওপর।