—ছবি সংগৃহীত
এক সময় যে নদীর স্বচ্ছ জলরাশি আর কলকল ধ্বনি পর্যটকদের মুগ্ধ করত, সেই সুরমা নদী আজ অস্তিত্ব সংকটে। সিলেট নগরীর টন টন বর্জ্য আর পলিথিনের স্তূপে নদীটি এখন অঘোষিত এক ডাম্পিং সাইটে পরিণত হয়েছে। নাব্য সংকট, দখলদারিত্ব আর ভয়াবহ দূষণে সুরমা এখন মৃতপ্রায়।
বর্জ্যের ভাগাড়ে হারিয়ে যাচ্ছে নদী
সরেজমিন দেখা গেছে, সিলেট নগরীর অন্তত ৫০টি স্থানে ময়লা-আবর্জনার বিশাল স্তূপ জমেছে। নদীর তীরজুড়ে পচা সবজি, প্লাস্টিকের বোতল, ক্লিনিক্যাল বর্জ্য, পলিথিন এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ ও গৃহস্থালির আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। দূর থেকে দেখলে এখন আর একে নদী মনে হয় না, মনে হয় বিশাল এক ময়লার ভাগাড়।
নগরীর তোপখানাঘাট, মেন্দিবাগ, কালীঘাট, ঝালোপাড়া, কদমতলী, চাঁদনীঘাট, কাজীরবাজার, শেখঘাট ও কানিশাইল ঘাটে দূষণের ভয়াবহ চিত্র চোখে পড়ে। বিশেষ করে কালীঘাট ও কাজীরবাজার এলাকায় সরাসরি শৌচাগারের বর্জ্য নদীতে মিশছে। পরিবেশবিদদের মতে, নদীর তলদেশে ৫ থেকে ৬ ফুট পর্যন্ত পলিথিনের স্তর জমে গেছে।
ঐতিহ্যের নাব্য সংকট ও দখলদারিত্ব
যে নদী এক সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নৌ-বাণিজ্যিক পথ ছিল, বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে সেটি স্থবির হয়ে পড়েছে। স্থানে স্থানে চর জেগে ওঠায় লোকজন এখন হেঁটেই নদী পার হচ্ছেন। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, সুরমা বর্তমানে ১৫০ জন অবৈধ দখলদারের কবলে। সিলেট বিভাগ জুড়ে ৩১টিরও বেশি নদী এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি
নদীর এই বিষাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা মখলিছুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, "নদীর সর্বনাশ আমরাই ডেকে এনেছি। এক সময় এই পানি পান করতাম, এখন কাছে যাওয়াই কঠিন। মাছের দেখা নেই, উল্টো আবর্জনার কারণে মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে নদীটি।"
সুরমা বাঁচাতে সাত দফা সুপারিশ
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা লাকী সুরমা পুনরুজ্জীবনে সাতটি জরুরি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন:
দ্রুত নদী খনন ও পলি অপসারণ।
অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও জমি উদ্ধার।
নিয়মিত পলিথিন অপসারণ অভিযান।
পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন ও বর্জ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করা।
বর্জ্য নিক্ষেপকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা।
সরকারের নীতিনির্ধারক ও মন্ত্রীদের বিশেষ সুদৃষ্টি।
মসজিদ-মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানিয়েছেন, নদী খননের জন্য একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) মো. একলিম আবেদীন বলেন, "আমরা নাগরিকরা সচেতন না হলে শুধু অভিযান দিয়ে এই দূষণ রোধ করা সম্ভব নয়।"
আগামী প্রজন্মের কাছে সুরমাকে ইতিহাসের পাতা থেকে জীবন্ত নদী হিসেবে টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নগরবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা এখন সময়ের দাবি।