—ছবি সংগৃহীত
ঢাকা নির্বাচনের মাত্র ৯ দিন বাকি থাকতে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ঝুলে থাকা 'শিক্ষা আইন' প্রণয়নে অন্তর্বর্তী সরকারের আকস্মিক তোড়জোড় নিয়ে সারাদেশে বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করে এবং ছুটির দিনসহ মাত্র ছয় দিন সময় দিয়ে মতামত চাওয়া কেবল 'আইন পাসের আনুষ্ঠানিকতা' রক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রস্তাবিত এই খসড়াটি যুগোপযোগী হওয়ার বদলে ১৯৯০ সালের পুরনো ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি বলে মনে করছেন তারা।
১. অষ্টম নয়, প্রাথমিক শিক্ষা থাকছে পঞ্চমেই
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল। এমনকি গত বছরের মে মাসেও সরকার এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত খসড়ায় প্রাথমিক শিক্ষাকে পুনরায় পঞ্চম শ্রেণিতেই সীমাবদ্ধ রেখে একে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাড়ে তিন দশক ধরে যা কার্যকর আছে, নতুন আইনে তারই প্রতিফলন ঘটানো শিক্ষাব্যবস্থাকে পিছিয়ে দেওয়ার শামিল।
২. নামমাত্র সময়, লোক দেখানো মতবিনিময়
গত ১ ফেব্রুয়ারি (রবিবার) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে খসড়াটি প্রকাশ করে মতামত দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে শুক্র ও শনিবার মিলিয়ে তিন দিনই সরকারি ছুটি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় বিষয়ে মাত্র কয়েক দিনের সময়সীমা দেওয়াকে 'রহস্যজনক' ও 'অগণতান্ত্রিক' বলে আখ্যা দিয়েছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী।
৩. কোচিং ও নোট-বইয়ের ‘বৈধতা’ দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা
শিক্ষা আইনের অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল কোচিং বাণিজ্য ও গাইড বই বন্ধ করা। কিন্তু খসড়ায় বলা হয়েছে, আইন কার্যকর হওয়ার পর পরবর্তী ৩ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত এগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে চলতে পারবে। সমালোচকদের মতে, ১৯৮০ সালের আইন অনুযায়ী যেখানে নোট-বই নিষিদ্ধ, সেখানে নতুন আইনে সেগুলোকে আরও কয়েক বছর সময় দেওয়া মূলত বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়ার নামান্তর।
৪. বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা
মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অধ্যাপক মনজুর আহমদের নেতৃত্বে গঠিত ১০ সদস্যের পরামর্শক কমিটি এখনো তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগেই আইনের খসড়া চূড়ান্ত করায় প্রশ্ন উঠেছে— বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশগুলো কি তবে আমলেই নেওয়া হবে না? এর আগে প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে দেওয়া শতাধিক সুপারিশের অধিকাংশই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
৫. খসড়ায় আরও যা আছে
শিক্ষাক্রম: প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত জাতীয় শিক্ষাক্রম বাধ্যতামূলক হবে। কওমি মাদ্রাসার মানোন্নয়নে সরকার ব্যবস্থা নেবে।
শাস্তি ও নিয়োগ: শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ এনটিআরসিএ-র মাধ্যমেই হবে, তবে উচ্চতর পদের নিয়োগ নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।
চেতনা ও সংস্কৃতি: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ, গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও দেশীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী কোনো কার্যক্রম চালানো যাবে না।
প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষাবিদরা
রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, "শিক্ষা আইন সব শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জীবনকে প্রভাবিত করবে। এত অল্প সময় দিয়ে মতামত চাওয়া বোধগম্য নয়। এই খসড়ায় আগামীর কোনো সুস্পষ্ট পথরেখা নেই।"
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খসড়াটি আগে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি বলে এখন দ্রুত করা হচ্ছে, তবে যৌক্তিক মতামত পেলে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে। কিন্তু নির্বাচনের মুখে এই 'তড়িঘড়ি' শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলের।