—ছবি সংগৃহিত
দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত এক বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে।
১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারের যে সুপারিশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় করেছে, তা কার্যকর হলে নিটওয়্যার পণ্য উৎপাদনকারীদের ওপর প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত করের বোঝা চেপে বসতে পারে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প তার প্রতিযোগিতার সক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলবে।
শুল্কের নতুন মারপ্যাঁচ: আমদানিতে গুণতে হবে চড়া মূল্য
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পাঠানো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের যে অনুরোধ জানানো হয়েছে, তাতে এইচএস কোড ৫২০৫ ও ৫২০৬ ভুক্ত সুতা আমদানিতে ব্যয় আকাশচুম্বী হবে। হিসাব অনুযায়ী:
কটন সুতা (৫২০৫): আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, অগ্রিম আয়কর ও অগ্রিম শুল্ক মিলিয়ে আমদানিকারককে মোট ৩৯.৭৫ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হবে।
মিশ্র সুতা (৫২০৬): এই ক্ষেত্রে শুল্কহার দাঁড়াবে প্রায় ৩৩.৬৩ শতাংশ।
বন্ড সুবিধা না থাকলে এই বিশাল অঙ্কের টাকা আমদানির আগেই পরিশোধ করতে হবে, যা উদ্যোক্তাদের নগদ অর্থ বা তারল্য সংকটে ফেলবে।
নিটওয়্যার খাতের ওপর সরাসরি আঘাত
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট পোশাক রপ্তানির অর্ধেকের বেশি (প্রায় ৫৩.৬ শতাংশ) আসে নিটওয়্যার খাত থেকে, যার মূল্যমান ২০.৮০ বিলিয়ন ডলার। এই খাতের প্রধান কাঁচামাল হলো ১০-৩০ কাউন্টের সুতা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, "বিশ্বজুড়ে এমনিতেই উৎপাদন খরচ বেড়েছে এবং রপ্তানিতে নেতিবাচক ধারা চলছে। এমন সময়ে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার মানে হলো তৈরি পোশাক শিল্পকে খাদের কিনারে ঠেলে দেওয়া।"
অর্ডার হারানোর শঙ্কা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা
বিকেএমইএ-র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন, কাঁচামালের দাম বাড়লে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে তাদের কার্যাদেশ সরিয়ে ভারত, ভিয়েতনাম কিংবা কম্বোডিয়ায় নিয়ে যেতে পারে। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বিপরীতমুখী অবস্থান
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা এই সিদ্ধান্তের কড়া বিরোধিতা করলেও দেশীয় স্পিনিং মিল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ দীর্ঘদিন ধরে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে রপ্তানিকারকদের দাবি, দেশীয় মিলগুলো চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত বা প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে সুতা সরবরাহ করতে না পারায় আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
এই সংকট নিরসনে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ যৌথভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে আদেশ বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে। শিল্পের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।