—ছবি সংগৃহিত
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কার্যক্রমে সরাসরি পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ২০০৮ সালের মতো কোনো ‘ভারসাম্যহীন’ (Imbalanced) নির্বাচন তারা এবার মেনে নেবে না।
আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দলের এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন।
কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনের ভেতরে একটি বিশেষ গোষ্ঠী সক্রিয় যারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, "নির্বাচন কমিশন একটি বিশেষ দলের প্রতি নগ্ন পক্ষপাত করছে। আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, মাঠ পর্যায়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির পরিবর্তে পক্ষপাতমূলক আচরণ করা হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা যদি অবিলম্বে ইসির এই পক্ষপাতমূলক আচরণের প্রতিকার না করেন, তবে জামায়াত জনগণকে সাথে নিয়ে শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।"
২০০৮ সালের নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতা
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেন। সে সময় বিএনপি-জামায়াত জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে শোচনীয় ফলাফলের সম্মুখীন হয়েছিল, যার পর আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সূচনা হয়। ডা. তাহের বলেন, "২০০৮ সালের মতো ‘ইমব্যালান্সড ইলেকশন’ বা ভারসাম্যহীন নির্বাচন আর হতে দেওয়া হবে না। কোনো ষড়যন্ত্রের নির্বাচন বাংলার মাটিতে কাম্য নয়।"
উল্লেখ্য যে, ২০০৮ সালের সেই নির্বাচনে জামায়াত মাত্র ২টি এবং বিএনপি ৩০টি আসন পেয়েছিল। এরপর বিগত তিনটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করে, যা ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে।
উপদেষ্টাদের ভূমিকা ও প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ
জামায়াতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত করা হচ্ছে না। আবদুল্লাহ তাহের বলেন, "নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত হচ্ছে না। কিন্তু সরকারের ভেতর থাকা কিছু উপদেষ্টা প্রধান উপদেষ্টাকে সব খবর দিচ্ছেন না। দেশ যদি একটি প্রশ্নবিদ্ধ বা বাজে নির্বাচনের দিকে এগোতে থাকে, তবে জামায়াত চুপ করে বসে থাকবে না।"
বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের বর্তমান চিত্র
দীর্ঘদিনের মিত্রতা ছিন্ন করে এবার বিএনপি ও জামায়াত আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। গতকালই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিইসি-র কাছে ইসির কর্মকর্তাদের পক্ষপাতের অভিযোগ জানিয়ে আসার পরদিনই জামায়াতের এই বক্তব্য এল। ভোটের আগে দুই দলের নেতাদের পাল্টাপাল্টি আক্রমণ ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
ইসলামি দলগুলোর সমীকরণ
জামায়াত এবার ইসলামি দলগুলোকে নিয়ে একটি বৃহত্তর জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সেই জোট ছেড়ে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে, তিনটি ইসলামি দল বিএনপির সাথে আসন সমঝোতা করেছে।
এই বিভাজন নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল্লাহ তাহের বলেন, "এটি নির্বাচনে বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না। দেশের ইসলামপন্থীরা পরিবর্তন ও ইসলামের পক্ষে রায় দেওয়ার জন্য মনস্থির করেছেন। কোনো দল ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু জনগণের সিদ্ধান্ত বদলাবে না।"
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াতের এই লড়াই এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা দেশের রাজনীতির গতিপথ কোন দিকে নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।