বরাদ্দ ঝুলে থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোটকেন্দ্র প্রস্তুতিতে স্থবিরতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে সময় হাতে আছে মাত্র এক মাস। দেশের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক, তাই এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সরকারি বরাদ্দ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ভোটকেন্দ্র প্রস্তুতিতে শিক্ষা প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভোটকেন্দ্র সংস্কার ও প্রস্তুতির জন্য কোনো আর্থিক বরাদ্দের তথ্য তারা এখনো পাননি। ফলে কাগজে-কলমে চিঠি এলেও মাঠপর্যায়ে কার্যত কোনো কাজ শুরু হয়নি। যদিও কিছু প্রতিষ্ঠান নিজস্ব উদ্যোগে সীমিত পরিসরে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
চিঠি আছে, কিন্তু অর্থের খোঁজ নেই
গত ২৮ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত ভবন সংস্কার, মেরামত, সিসি ক্যামেরা স্থাপন বা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ইসির আলাদা অনুমতির প্রয়োজন হবে না।
তবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, ভোটকেন্দ্র প্রস্তুতির জন্য কোনো বরাদ্দের তথ্য তাদের কাছে নেই। তিনি জানান, অর্থ ছাড়া সংস্কার বা মেরামত কীভাবে হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণাও নেই।
অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাতে অনিচ্ছুক।
প্রস্তুতির চাহিদা বেশি, সময় কম
এবারের নির্বাচনে সারা দেশে ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরুষ ও নারী ভোটারের জন্য মোট ২ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি কক্ষ ব্যবহার করা হবে। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানো হয়েছে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোট চলবে, এরপর শুরু হবে গণনা, যা রাত পর্যন্ত গড়াতে পারে।
ফলে কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আলো, বিদ্যুৎ, টয়লেট, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ভোটের আগের রাতেই কেন্দ্রগুলোতে ব্যালটসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছানো হবে এবং দুই রাত কেন্দ্র খোলা থাকবে।
কিন্তু উপজেলা পর্যায়ের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাতে ব্যবহারের মতো বৈদ্যুতিক বাতি নেই, টয়লেট ব্যবস্থাও অপ্রতুল। এসব উন্নয়নে অর্থের প্রয়োজন হলেও বরাদ্দ না থাকায় প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষরা দোটানায় পড়েছেন।
নির্দেশনার অপেক্ষায় মাঠপর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তারা
জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা ভোটকেন্দ্র হতে পারে—এমন প্রতিষ্ঠানের তালিকা জমা দিলেও সংস্কার বা প্রস্তুতি সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাননি। কোথা থেকে অর্থ আসবে, কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে—এসব বিষয় অজানা রয়ে গেছে।
গাইবান্ধা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান সরকার বলেন, তালিকা জমা দেওয়া হলেও বাস্তব প্রস্তুতি শুরু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই।
রাজবাড়ীর একটি কলেজের অধ্যক্ষ জানান, নিজস্ব তহবিল না থাকায় এবং গভর্নিং বডি অনুপস্থিত থাকায় তারা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
ঢাকায় নিজস্ব তহবিল ব্যবহারের ইঙ্গিত
ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিস থেকে ৬ জানুয়ারি দেওয়া চিঠিতে ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা, আলো ও টয়লেট সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে বিধি অনুযায়ী খরচ করার নির্দেশও দেওয়া হয়।
তবে ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মজিদ বলেন, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নিজস্ব অর্থে এসব কাজ করা সম্ভব নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভোটের দিন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ইসির আশ্বাস, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
ইসি সচিব আখতার আহমেদ দাবি করেন, বরাদ্দ না পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তার ভাষায়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো প্রয়োজনীয় অর্থ দিতে বাধ্য থাকবে। কেউ গড়িমসি করলে নির্বাচন কমিশন কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
তবে মাঠপর্যায়ে বরাদ্দের অনিশ্চয়তা ও প্রস্তুতির ধীরগতিতে বাড়ছে উদ্বেগ। সময়মতো সমাধান না হলে ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে নির্বাচন কমিশন।