৮ জানুয়ারি, ২০২৬

যে বৈঠকে রচিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতির ভিত

যে বৈঠকে রচিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতির ভিত

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে তিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডনে পৌঁছান।

সেই দিন সন্ধ্যায় লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক বৈঠকটি ছিল বিশ্বমঞ্চে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার এক অনন্য সোপান।

‘রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবেই হওয়া উচিত’
বৈঠকের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু তাঁকে কারামুক্ত করতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি ২৫ মার্চের কালরাত্রির স্মৃতিচারণ করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আলোচনার আড়ালে কীভাবে ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিলেন। বঙ্গবন্ধু স্পষ্টভাবে জানান, পাকিস্তানের বর্বর বাহিনী তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ঘর পুড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে আত্মসমর্পণের প্রাক্কালে বুদ্ধিজীবীদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, এরপর আর তাদের সঙ্গে একসাথে থাকা বাঙালির পক্ষে সম্ভব নয়।

পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের চালচিত্র
আলোচনায় বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণের খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি উদাহরণ দেন, যখন ৪৫ রুপিতে ভারতীয় কয়লা পাওয়া যেত, তখন বাঙালিদের ১২৫ রুপিতে চীন থেকে কয়লা কিনতে বাধ্য করা হতো। চা ও পাটের বাজার ধ্বংসের মাধ্যমে বাঙালিকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা হয়েছিল। তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টোর ‘শিথিল ফেডারেশন’-এর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানান, সেই সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে।

‘প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড’ গড়ার স্বপ্ন
বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে জানান, তিনি একটি বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলার পরিবর্তে সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহারে বিশ্বাসী। তাঁর স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশকে ‘প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে গড়ে তোলা। এছাড়া ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার প্রসঙ্গে তিনি জানান, দিল্লি হয়ে ঢাকা ফেরার পর তিনি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা করে একটি সুনির্দিষ্ট প্রত্যাহার পরিকল্পনা তৈরি করবেন।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার
বৈঠকের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করে জানান, ব্রিটিশ বাণিজ্যিক প্রতিনিধিরা ইতিমধেই যোগাযোগ শুরু করেছেন। বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট করেন যে, স্বীকৃতি পেলেই তিনি কমনওয়েলথের সদস্য হতে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংগ্রহ করতে আগ্রহী।

ঋণের দায়ভার ও ন্যায়বিচার
পাকিস্তানের সামগ্রিক ঋণের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান ছিল অত্যন্ত যুক্তিবাদী। তিনি বলেন, বাংলার উন্নয়নে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, কেবল সেই ঋণের দায়ভারই বাংলাদেশ নেবে। তিনি প্রয়োজনে এই বিরোধ নিষ্পত্তিতে ব্রিটেনের মাধ্যমে সালিশকারী নিয়োগের প্রস্তাব দেন।

বৈঠকের গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক দলিল
১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সেই বৈঠকটি কেবল একটি ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের আন্তর্জাতিক বৈধতা লাভের প্রথম আনুষ্ঠানিক ধাপ। এফসিও (FCO) থেকে সংগৃহীত এই বৈঠকের কার্যবিবরণীটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল, যা অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান।