বাংলাদেশের রাজনীতির এক মহাপ্রয়াণ যখন শোকের সাগরে ভাসিয়েছে গোটা দেশকে, ঠিক তখনই প্রতিবেশী ভারতের পক্ষ থেকে এলো এক অভাবনীয় কূটনৈতিক বার্তা।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গভীর শোক প্রকাশ এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে পাঠানো বিশেষ চিঠিটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে খালেদা জিয়ার কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর স্বয়ং এই চিঠিটি তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন।
‘দৃঢ় সংকল্পের বিরল নেত্রী’: মোদির চোখে খালেদা জিয়া
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর চিঠিতে খালেদা জিয়াকে কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়, বরং আধুনিক বাংলাদেশের অন্যতম কারিগর হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন। ২০১৫ সালের ঢাকা সফরে খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত আলাপের স্মৃতিচারণ করে মোদি লেখেন:
“তিনি ছিলেন দৃঢ় সংকল্প ও বিশ্বাসের বিরল এক নেত্রী। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যে গৌরব অর্জন করেছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী থাকবে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শক্তিশালী করতে তাঁর অবদান আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।”
তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘নতুন সূচনা’র প্রত্যাশা
বিশ্লেষকদের মতে, মোদির এই চিঠির সবচাইতে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি দিল্লির অকুণ্ঠ সমর্থন ও স্বীকৃতির ইঙ্গিত। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বর্তমানে ভারতে অবস্থান করলেও, মোদি সরাসরি তারেক রহমানকে সম্বোধন করে লিখেছেন:
“আমি নিশ্চিত, আপনার দক্ষ নেতৃত্বে বিএনপি বেগম জিয়ার আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ভারত ও বাংলাদেশের গভীর ঐতিহাসিক অংশীদারিত্বের এক ‘নতুন সূচনা’ নিশ্চিত করতে আপনার নেতৃত্ব একটি পথপ্রদর্শক আলো হিসেবে কাজ করবে।”
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ভারতের সঙ্গে বিএনপির যে ‘কূটনৈতিক দূরত্ব’ ছিল, এই একটি চিঠির মাধ্যমে সেই বরফ পুরোপুরি গলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের প্রতি মোদির শুভকামনা আদতে বিএনপির আগামীর শাসনকালের প্রতি আগাম বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো।
জয়শঙ্করের সফর: সম্মানের ও বন্ধুত্বের বার্তা
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফরটি ছিল প্রতীকী অর্থে অত্যন্ত শক্তিশালী। তিনি কেবল শোক প্রকাশ করতে আসেননি, বরং বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে বুঝিয়ে দিয়েছেন—দিল্লি এখন বাংলাদেশের ক্ষমতার সম্ভাব্য পরিবর্তনের বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত। জয়শঙ্কর ও তারেক রহমানের এই করমর্দন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপির জন্য এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জামায়াত, বিএনপি ও ভারত: ত্রিমুখী মেরুকরণ
রয়টার্সের প্রতিবেদনে জামায়াত আমীরের সঙ্গে ভারতীয় কূটনীতিকের গোপন বৈঠকের খবর আসার পর মোদির এই প্রকাশ্য শোকবার্তা প্রমাণ করে—ভারত আর কেবল একটি দলের ওপর নির্ভর করে নেই। তারা বাংলাদেশের সকল প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের পথে হাঁটছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারার এই সময়ে বিএনপির প্রতি ভারতের এই সহমর্মিতা আগামী নির্বাচনকে এক নতুন মাত্রা দিল।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জনমত
নরেন্দ্র মোদি তাঁর চিঠিতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রতিও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশের জনগণ তাঁদের ইতিহাসে অসাধারণ শক্তি ও মর্যাদা প্রদর্শন করেছেন। গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে দেশ এগিয়ে যাবে—মোদির এমন আশাবাদ অন্তর্র্বতী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া এবং আসন্ন নির্বাচনের প্রতি দিল্লির পরোক্ষ সমর্থন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
শোক থেকে শক্তির পথে
বেগম খালেদা জিয়ার বিয়োগান্তক বিদায় যেন দুই প্রতিবেশীর শীতল সম্পর্কের মাঝে এক উষ্ণ ‘ডিপ্লোম্যাটিক উইন্ডো’ খুলে দিল। নরেন্দ্র মোদির এই চিঠিটি কেবল একটি শোকবার্তা নয়; এটি ২০২৬-এর নতুন বাংলাদেশে ভারত-বিএনপি সম্পর্কের এক নতুন ‘মেনিফেস্টো’। প্রিয় নেত্রীর বিদায়ে যখন বিএনপি শোকাতুর, ঠিক সেই মুহূর্তে দিল্লির এই স্বীকৃতি দলটির জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক শক্তিতে পরিণত হলো।