২০২৫ বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের সংকেত দিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ভারতের কূটনীতিকের সাথে গোপন বৈঠকের তথ্য ফাঁস করার পাশাপাশি নির্বাচনের পর একটি ‘ঐক্যের সরকার’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
দিল্লির সাথে বরফ গলানোর চেষ্টা?
সাক্ষাৎকারে ডা. শফিকুর রহমান স্বীকার করেছেন যে, এ বছরের শুরুর দিকে ভারতের একজন কূটনীতিকের সাথে তাঁর বৈঠক হয়েছে। তবে সেই বৈঠকটি অন্যান্য দেশের কূটনীতিকদের মতো প্রকাশ্য ছিল না। জামায়াত আমীরের ভাষ্যমতে, ভারতীয় ওই কর্মকর্তা বৈঠকটি গোপন রাখার অনুরোধ করেছিলেন।
ভারত-বিদ্বেষী তকমা ঘুচিয়ে দিল্লির সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে জামায়াতের আগ্রহ এখন স্পষ্ট। তিনি বলেন, “আমাদের সবার কাছে এবং একে অপরের কাছে উন্মুক্ত হতে হবে। পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়ন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।” তবে পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠতার প্রশ্নে তিনি জানান, জামায়াত কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকতে আগ্রহী নয়, বরং সবার সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
নির্বাচনী সমীকরণ: ‘কিং মেকার’ থেকে ‘ঐক্যের সরকার’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। জনমত জরিপগুলোর বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ১৭ বছর পর নির্বাচনে ফিরে জামায়াত জনপ্রিয়তায় বিএনপির ঠিক পরেই অবস্থান করছে।
তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে নির্বাচনী জোট গড়ার পর ডা. শফিকুর রহমান এখন ‘ঐক্যের সরকার’ গঠনের স্বপ্ন দেখছেন। তিনি বলেন:
দেশকে স্থিতিশীল রাখতে অন্তত ৫ বছরের জন্য বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে একটি সরকার প্রয়োজন।
যে দল সবচাইতে বেশি আসন পাবে, প্রধানমন্ত্রী হবেন সেই দল থেকেই।
জামায়াত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা দল নির্ধারণ করবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান ও রাষ্ট্রপতির ইস্যু
জামায়াত আমীর স্পষ্ট করেছেন যে, যেকোনো ঐক্যের সরকারের প্রধান শর্ত হতে হবে ‘দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান’। এছাড়া বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, জামায়াত সংশ্লিষ্ট কোনো সরকার তাঁকে নিয়ে ‘স্বস্তি বোধ’ করবে না। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ইতিমধ্যে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা ও ভারত প্রসঙ্গ
ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থানকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর মতে, এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
যেসব কারণে এই সাক্ষাৎকারটি গুরুত্বপূর্ণ?
. কূটনৈতিক শিফট: জামায়াত ও ভারতের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আসা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
. বিএনপির সাথে দূরত্ব? এককভাবে সরকার গঠনের বদলে ‘ঐক্যের সরকার’ এর কথা বলে জামায়াত সম্ভবত ক্ষমতার ভাগাভাগিতে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে চাইছে।
. আওয়ামী লীগ বিহীন মাঠ: দীর্ঘ সময় পর নিবন্ধন ফিরে পাওয়া এবং এনসিপির মতো তরুণ প্রজন্মের দলের সাথে জোটবদ্ধ হওয়া জামায়াতকে নির্বাচনী লড়াইয়ে নতুন শক্তিতে রূপান্তর করেছে।