বাংলাদেশের রাজনীতির মানচিত্রে গত চার দশক ধরে যে নামটি ছিল সাহসিকতা ও অটল সিদ্ধান্তের সমার্থক, সেই বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে একটি বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামমুখর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোরে তাঁর জীবনাবসান কেবল একটি দলের অভিভাবক বিয়োগ নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিশাল রাজনৈতিক যুগের যবনিকা। গৃহবধূ থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার এই সফরটি ছিল ত্যাগে ভাস্বর এবং আপসহীনতায় অদম্য।
আপসহীনতার প্রথম অগ্নিপরীক্ষা
বেগম জিয়ার রাজনৈতিক স্বকীয়তা প্রথম ফুটে ওঠে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে। স্বৈরশাসক এরশাদের অধীনে সেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার হাতছানি অনেক বড় দল উপেক্ষা করতে না পারলেও, খালেদা জিয়া ছিলেন অনড়। প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা নির্বাচনে গেলেও তিনি রাজপথের সংগ্রামকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর শপথ গ্রহণ প্রমাণ করেছিল যে, নীতির প্রশ্নে অনমনীয়তা শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।
ওয়ান-ইলেভেন ও দেশ না ছাড়ার বজ্রকঠিন শপথ
২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যখন ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার মাধ্যমে দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ তৈরি হয়েছিল, তখন খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল হিমালয়সদৃশ। শেখ হাসিনা বিদেশে পাড়ি দিলেও খালেদা জিয়া পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন—"এ দেশেই আমার জন্ম, এ দেশেই আমি মরব।" তাঁর এই একগুঁয়ে দেশপ্রেমই সেদিন বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে দুই প্রধান নেত্রীকে মাইনাস করার চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছিল।
কারাবরণ ও রাজপথের নিঃসঙ্গ লড়াই
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ২০১৮ সালে তাঁকে কারাগারে যেতে হয়। কিন্তু সেই প্রতিকূল সময়েও তিনি নতি স্বীকার করেননি। ২০১৭ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়েও সাজা এড়াতে সেখানে থেকে যাননি, বরং দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর জীবন ও রাজনীতি বারবার একটি সত্যই প্রতিষ্ঠিত করেছে—সব আপস রাজনৈতিক লাভ আনে না, আর সব অনমনীয়তাও পরাজয় নয়। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তাঁর পূর্ণ মুক্তি ছিল তাঁর দীর্ঘ ত্যাগের এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।
২০২৫: রাজনীতির সন্ধিক্ষণ ও বিদায়ী বেদনা
২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের জন্য এক যুগান্তকারী বছর। একদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের তোড়জোড়, অন্যদিকে বছরের শেষলগ্নে বেগম জিয়ার চিরবিদায়। তাঁর অসুস্থতা যখন চরমে, তখনো তিনি জাতীয় ঐক্যের এক মৌন প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং সারা দেশের মানুষের অশ্রুসজল বিদায় প্রমাণ করে, তিনি কেবল বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন না, ছিলেন এক জাতীয় আবেগের নাম।
উত্তরসূরির প্রত্যাবর্তন ও নতুন প্রত্যাশা
বেগম জিয়ার প্রয়াণের ঠিক পাঁচ দিন আগে ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন তাঁর বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মায়ের মৃত্যুশোক সামলে তিনি যখন দলের হাল ধরেছেন, তখন সামনে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও জুলাই সনদের গণভোট। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর নববর্ষের বাণীতে যে ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সেখানে খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ আদর্শ কতটুকু ছায়া দেবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বেগম খালেদা জিয়া এমন এক নেত্রী, যিনি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের বিশাল মূল্য দিয়েছেন। সেনানিবাসের বাড়ি হারানো থেকে শুরু করে ছোট ছেলের অকাল মৃত্যু—কোনো কিছুই তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তাকে টলাতে পারেনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন এমন একজন নেত্রী হিসেবে, যিনি শিখিয়েছেন—মাথা নত না করার নামই রাজনীতি।