৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫

ঘটনাবহুল ২০২৫ গেল নির্বাচনের অপেক্ষায়

ঘটনাবহুল ২০২৫ গেল নির্বাচনের অপেক্ষায়

বিদায়ী ২০২৫ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি ক্যালেন্ডার বছর হিসেবে নয়, বরং একটি ‘মহাসন্ধিক্ষণ’ হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী এই বছরটি ছিল পুরোনো ব্যবস্থার চিতাভস্ম থেকে নতুন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের দীর্ঘ লড়াইয়ের সাক্ষী। সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, রাজসিক প্রত্যাবর্তন এবং সবশেষে এক বিষাদময় প্রয়াণ—সব মিলিয়ে এই ১২টি মাস ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর।

১. ‘জুলাই সনদ’: রাষ্ট্র মেরামতের ঐতিহাসিক রোডম্যাপ
বছরের শুরু থেকেই প্রধান আলোচনা ছিল—নির্বাচন আগে না কি সংস্কার? অন্তর্বর্তী সরকার এই দুইয়ের মধ্যে এক সুনিপুণ ভারসাম্য তৈরি করেছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’, যার কাজ ছিল রাষ্ট্রের জরাজীর্ণ কাঠামো মেরামতের রূপরেখা তৈরি করা। দীর্ঘ আট মাসের নিরলস সংলাপ শেষে ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ৩০টি রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’।

সরকারের সবচাইতে সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনের দিনই এই সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপর গণভোট আয়োজন। এর ফলে ভোটদাতারা একই সাথে নতুন সরকার নির্বাচন করবেন এবং জুলাই বিপ্লবের চেতনা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন নিয়মাবলিতে শীলমোহর দেবেন।

২. নতুন রাজনীতি ও তারুণ্যের আস্ফালন
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জন্ম নেয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তরুণ ও সিভিল সোসাইটির মুখগুলো সরাসরি রাজনীতির মঞ্চে উঠে আসায় জনমনে প্রবল কৌতূহল তৈরি হয়। তবে বছর শেষে দলটি অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে পড়ে, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার প্রশ্নে। অন্যদিকে ইনকিলাব মঞ্চ, জামায়াত ও ইসলামপন্থী দলগুলোর বিশাল জনসমাবেশ প্রমাণ করেছে, আগামীর ভোটের লড়াইয়ে তারা এক শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

৩. রক্তক্ষয়ী ষড়যন্ত্র ও শহীদ ওসমান হাদির মহাপ্রয়াণ
নির্বাচনমুখী যাত্রার মধ্যেই গত ১২ ডিসেম্বর বড় ধাক্কাটি আসে। ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই হত্যাকাণ্ড এবং এর জেরে শাহবাগের টানা অবরোধ ২০২৫-এর শেষ দিনগুলোতে রাজনীতিতে এক চরম উত্তাপ ছড়িয়েছে। এই অস্থিরতা নতুন বছরে সরকারের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

৪. তারেক রহমানের রাজসিক প্রত্যাবর্তন
১৭ বছরের দীর্ঘ প্রবাস ও নির্বাসন কাটিয়ে ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশের মাটিতে পা রাখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর এই ফেরা ছিল আক্ষরিক অর্থেই ‘রাজসিক’। ঢাকার রাজপথ জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে দীর্ঘ নির্বাসনও তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবকে ম্লান করতে পারেনি। তারেক রহমানের এই ফেরা বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে এবং আগামী নির্বাচনে দলটিকে একক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

৫. এক গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান: খালেদা জিয়ার চিরবিদায়
বছরের সবচাইতে বড় শোকের ঘটনাটি ঘটে ৩০ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের রাজনীতির ধ্রুবতারা, ‘আপসহীন নেত্রী’ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে একটি যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে। গৃহবধূ থেকে রাজপথের লড়াকু সৈনিক হয়ে ওঠা এই নেত্রীর মৃত্যুতে গোটা জাতি শোকাচ্ছন্ন। আওয়ামী লীগ সরকারের নিপীড়ন, দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতা সহ্য করেও তিনি কখনো নতি স্বীকার করেননি। তাঁর এই বিয়োগান্তক বিদায় দেশের রাজনীতিতে এমন এক শূন্যতা তৈরি করেছে যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

৬. পুরোনো শাসনের চূড়ান্ত পতন
২০২৫ সাল দেখেছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত বিচারিক পরিণতি। ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ রুদ্ধ হওয়ায় দেশের রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে।

৭. ২০২৬-এর নতুন সূর্য ও ড. ইউনূসের স্বপ্ন
ইংরেজি নববর্ষ ২০২৬ উপলক্ষ্যে দেওয়া বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৬ সালকে ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণের বছর’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তাঁর ভাষায়, “সব গ্লানি ভুলে নতুন বছর আমাদের জীবনে সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলব।”

উপসংহার: ২০২৫ সাল ছিল মূলত আগামীর ভিত তৈরির বছর। একদিকে প্রিয় নেত্রীর জন্য দোয়া আর অন্যদিকে নতুন বছরের সম্ভাবনার আলো—এই দুইয়ের মধ্য দিয়েই ২০২৬-এর ভোরে পা রাখছে বাংলাদেশ। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং জুলাই সনদের ওপর গণভোটই বলে দেবে, এ দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত ‘নতুন বাংলাদেশ’ শেষ পর্যন্ত কোন পথে এগোবে।