বাংলাদেশের রাজনীতির এক মহাকাব্যিক ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ অধ্যায়ের অবসান ঘটল। জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা, কারাবাস এবং রাজনৈতিক চড়াই-উতরাইয়ের পর ৭৯ বছর বয়সে বিদায় নিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তাঁর এই প্রস্থান কেবল একটি দলের শীর্ষ নেতার চলে যাওয়া নয়, বরং দেশের চার দশকের রাজনৈতিক ভারসাম্যে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি।
গৃহবধূ থেকে রাজপথের ‘পুতুল’
১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম, যাঁর ডাকনাম ছিল ‘পুতুল’, শৈশবে ছিলেন শান্ত ও পরিপাটি। ১৯৬০ সালে তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ের পর তাঁর জীবন ছিল ছকে বাঁধা এক সাধারণ গৃহবধূর। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনকে প্রথমবার এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়। দুই শিশুপুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে যুদ্ধবন্দী হিসেবে কাটাতে হয়েছিল দুর্বিষহ দিনগুলো।
রাজনীতিতে তাঁর আসা ছিল অনেকটা ‘অনিবার্য আকস্মিকতা’। ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর দিকভ্রান্ত বিএনপিকে যখন অনেকে বিলুপ্তির পথে দেখছিলেন, তখনই ১৯৮২ সালে দলের হাল ধরেন তিনি। সাধারণ এক গৃহবধূ থেকে যেভাবে তিনি নিজেকে এক লড়াকু জননেত্রীতে রূপান্তর করেছিলেন, তা সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য উদাহরণ।
আপসহীনতার প্রতীক ও গণতন্ত্রের জয়যাত্রা
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন তাঁর ‘আপসহীন’ ভাবমূর্তি। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এরশাদের পতন ত্বরান্বিত করতে তিনি ছিলেন অবিচল। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তিনি যে নৈতিক অবস্থান নিয়েছিলেন, সেটিই তাঁকে জনগণের কাছে অপরাজেয় করে তোলে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে যখন বিশ্লেষকরা অন্য দলের জয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তখন সারা দেশ চষে বেড়িয়ে তিনি বিএনপিকে বিজয়ী করে আনেন।
তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালনকালে তাঁর শাসনামল ছিল উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের এক স্বর্ণযুগ। বিশেষ করে মেয়েদের উপবৃত্তি ও নারী শিক্ষার প্রসার তাঁর রাজনীতির সৌন্দর্যমণ্ডিত দিকের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। ৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ২৩টি আসনে নির্বাচন করে একটিতেও পরাজিত না হওয়ার রেকর্ড তাঁর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার স্বাক্ষর বহন করে।
শোক ও দীর্ঘ বঞ্চনার শেষ দিনগুলো
রাজনীতিতে যেমন তিনি সাফল্যের শিখরে উঠেছিলেন, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনে তাঁকে সইতে হয়েছে সীমাহীন বেদনা। ২০১১ সালে সেনানিবাসের মইনুল রোডের দীর্ঘ ৪০ বছরের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে উচ্ছেদের দিন তাঁর অশ্রুসজল মুখ আজও দেশবাসীর মনে গেঁথে আছে। ২০১৫ সালে বিদেশের মাটিতে ছোট ছেলে কোকোর অকাল মৃত্যু এবং বড় ছেলে তারেক রহমানের প্রবাস জীবন তাঁর জন্য ছিল বড় শোকের।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। গত কয়েক বছর ধরে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ আর হাসপাতালের কেবিনেই কেটেছে তাঁর নিঃসঙ্গ জীবন। তাঁর উন্নত চিকিৎসার দাবি নিয়ে যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলেছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।
শূন্যতা ও উত্তরাধিকার
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপি হারিয়েছে তাদের আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল। তাঁর অবর্তমানে দলের ঐক্য ধরে রাখা এবং রাজপথের রাজনীতিতে টিকে থাকা বর্তমান নেতৃত্বের জন্য হবে এসিড টেস্ট। তবে সমালোচকরা যাই বলুক, দুর্নীতির অভিযোগ বা ‘হাওয়া ভবন’ কেন্দ্রিক বিতর্কের চেয়েও ইতিহাসে তিনি বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নেত্রী হিসেবে।
আজকের এই শোকাতুর মুহূর্তে দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রতিধ্বনি—একজন মার্জিত, ধৈর্যশীল এবং হার না মানা নেত্রীর চিরবিদায়। যে ফুল আর পরিচ্ছন্নতা তিনি পছন্দ করতেন, সেই ভালোবাসার আবহে আজ বিদায় নিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর ‘আপসহীন’ আদর্শের যে ছাপ তিনি রেখে গেলেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক দলগুলো গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় আগামীকাল দেশব্যাপী শোক পালিত হবে।