৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫

সংসদীয় জীবনে অপরাজিত ‘দেশনেত্রী’: এক অনন্য রেকর্ডের অবসান

সংসদীয় জীবনে অপরাজিত ‘দেশনেত্রী’: এক অনন্য রেকর্ডের অবসান

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য ও ঈর্ষণীয় রেকর্ড গড়ে চিরবিদায় নিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আজ মঙ্গলবার সকাল ছয়টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, খালেদা জিয়াকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জিয়া উদ্যানে তাঁর স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই দাফন করা হতে পারে। আগামীকাল বুধবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২৩ আসনের লড়াইয়ে অপরাজিত
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর অজেয় নির্বাচনী যাত্রা। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি যতগুলো আসনে প্রার্থী হয়েছেন, তার প্রতিটিতেই জয়লাভ করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন রেকর্ড আর দ্বিতীয়টি নেই।

১৯৯১-২০০১: এই তিনটি নির্বাচনেই তিনি পাঁচটি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব কটিতেই জয়ী হন। ১৯৯১ সালে তিনি ফেনী ও বগুড়ার পাশাপাশি ঢাকার দুটি আসন থেকেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

২০০৮ সাল: প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও তিনি বগুড়া-৬, বগুড়া-৭ ও ফেনী-১ আসনে লড়ে সব কটিতেই জয় ছিনিয়ে আনেন।

নির্বাচনী বিশ্লেষকেরা বলছেন, খালেদা জিয়া শুধু জয়ীই হননি, প্রতিটি আসনেই তাঁর সঙ্গে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোটের ব্যবধান ছিল চোখে পড়ার মতো।

শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে পথিকৃৎ
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার শাসনামল বাংলাদেশের সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের সাক্ষী। তাঁর সরকারের আমলেই বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা এবং মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। এছাড়া ছাত্রীদের উপবৃত্তি এবং শিক্ষা কার্যক্রমে ‘খাদ্য সহায়তা’ চালুর মতো বৈপ্লবিক পদক্ষেপগুলো তাঁরই হাত ধরে এসেছিল। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করার কৃতিত্বও তাঁর সরকারের।

‘গৃহবধূ’ থেকে ‘ঐক্যের প্রতীক’
১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে আসা খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৪৩ বছর বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ‘আপসহীন নেত্রী’র পরিচিতি পাওয়ার পর ১৯৯১ সালে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

ব্যক্তিগত জীবনে জেল-জুলুম ও আপনজন হারানোর পাহাড়সম শোক সইলেও তিনি দেশ ছাড়েননি। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে দলমত-নির্বিশেষে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক ‘জাতীয় অভিভাবক’। গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর তাঁর দেওয়া সেই বার্তা—‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, ভালোবাসা ও শান্তিভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি’—মানুষের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিল।

অন্তিম যাত্রার প্রস্তুতি
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “জাতি আজ তার এক মহান অভিভাবককে হারাল।” সরকার তাঁকে চলতি মাসেই রাষ্ট্রের ‘অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। প্রিয় নেত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে এখন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় ব্যাপক প্রস্তুতির পাশাপাশি মানুষের ঢল নামতে শুরু করেছে।