২৭ নভেম্বর, ২০২৫

প্রায় আড়াই বছর ধরে প্রতিবন্ধী নারীর ভাতা আত্মসাৎ

 প্রায় আড়াই বছর ধরে প্রতিবন্ধী নারীর ভাতা আত্মসাৎ

নওগাঁর বদলগাছীতে প্রায় আড়াই বছর ধরে এক অসহায় প্রতিবন্ধী নারীর ভাতার টাকা স্বামী প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমানের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন এলাকার সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য তাহমিনা আক্তার।

টাকা আত্মসাৎ এর বিষয়টি জানাজানির পর বদলগাছীর পাহাড়পুরে গ্রাম-মহল্লা থেকে চায়ের দোকান সবখানেই চলছে ক্ষোভের ঝড়। যে শিক্ষক নৈতিকতা শেখাবেন, যিনি নতুন প্রজন্মের হাতে মানবতার আলো তুলে দেবেন,তার হাতেই জ্বলে উঠেছে অনিয়মের কালো দাগ।তা না হলে জনপ্রতিনিধি হয়ে প্রতিবন্ধীর ভাতা নিজের স্বামীর একাউন্টে নিয়ে আত্মসাৎ করেন কেমনে। 

তাহমিনা বেগম বদলগাছী উপজেলার ৩নং পাহাড়পুর ইউনিয়নে  সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য এবং স্বামী উপজেলার শেরপুর দ্বি-মূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান এবং  মিজানুর রহমান পাহাড়পুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের পাঁচঘরিয়া গ্রামের নজরুলের প্রতিবন্ধী স্ত্রী মোসা. মুক্তা (৪০) প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার জন্য স্থানীয় মহিলা সদস্য তহমিনার কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন।মহিলা সদস্য তহমিনা ও তার স্বামী মিজানুর রহমান ২০২৩ সালের ১ জুলাই তার নামে ভাতার কার্ড করে দেন ঠিকই, কিন্তু সেখানে ভাতাভোগীর মোবাইল নম্বর না দিয়ে তহমিনার স্বামী শেরপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও পাহাড়পুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ- সভাপতি মিজানুর রহমান তার নম্বর বসিয়ে দেন। এরপর থেকেই নিয়মিত ভাতা তুলছেন ওই প্রধান শিক্ষক।

ভাতা যে আসছে সে বিষয়টি ভাতাভোগী মোসা. মুক্তাকে  জানানো হয়নি,টাকাও দেওয়া হয়নি। প্রায় আড়াই বছর ধরে মহিলা ইউপি সদস্য তাহমিনার মাধ্যমে টাকা প্রতিমাসেই টাকা তুলেছেন তিনি, অথচ প্রকৃত ভাতাভোগী রয়েছেন অন্ধকারে।

হয়তো আরও কয়েক বছর এভাবেই চলত। কিন্তু চলতি নভেম্বরের মাঝামাঝি নতুন ভাতার আবেদন নিতে সমাজসেবা অফিস থেকে ঘোষণা দেওয়ার পর মোসা. মুক্তা অফিসে গিয়ে জানতে পারেন। তার নামে আড়াই বছর ধরে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এ কথা শুনে তার চোখে-মুখে হতবাক হয়ে যান। পরে এলাকাজুড়ে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা।

মুক্তা বলেন “প্রায় আড়াই বছর আগে মেম্বার তহমিনা আমার কাগজপত্র নিয়েছিলো। বারবার জিজ্ঞেস করলে বলতো হয়ে যাবে। কিন্তু আমি কোনো টাকা পাইনি। সমাজসেবা অফিসে কয়েকদিন আগে গিয়ে শুনলাম, আমার নামে ভাতা তো হয়েছে অনেক আগে, মোবাইল নম্বরও আমার না মেম্বারের স্বামীর।”

তিনি আরও জানান,“এলাকায় বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মহিলা মেম্বারের স্বামিনী মিজানুর মাস্টার আমাকে ১০ হাজার টাকা দিতে চেয়েছে। কয়েকদিন পর পাহাড়পুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর মাস্টার ও মাসুদ মেম্বার আমার বাড়ি এসে ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। কিন্তু আড়াই বছরের টাকা তো প্রায় ৩০ হাজার টাকা হয়। আমার প্রতিবন্ধী ভাতার বাকী টাকা দিলো না কেন?

ভুক্তভোগীর স্বামী নজরুল বলেন, 
অফিস থেকে নতুন করে মাইকিং করলে আমার বন্ধুর যে সমাজ সেবায় চাকুরি করে,তাকে কার্ড দেখালে সে বলে কার্ডে তো টাকা ঢুকেছে। নাম্বারডা দেখো তো। এডা তো আমার নাম্বার নয়। নাম্বার টা কার জানতে চাইলে সে বলে জয়পুরহাট কাস্টমার কেয়ারে যেতে বলে। আমি সেখানে গেলে নাম্বারটি নাম মিজানুর রহমান মাষ্টার ভেসে উঠে।

আমি তার কাছে গেলে সে মিথ্যা কথা বলে,যে আমি ওটা দেইনি আমি জানিনা। আমার বউ কি করছে না করছে। তারপর সাংবাদিক আছিলো হিমু, সে এসে সরাসরি ফোন দিছিলো, সে তখন বলে আমি ওলা জানিনা, প্রতিবন্ধীর টাকা খাওয়া মানে বিরাট কিছু।যেভাবে হোক একটা আপোষ করেন না হলে আপনার চাকরি নিয়ে টানা টানা উঠে যাবে।

পরে আমাদের যে নেতা আছে জিল্লুর মাষ্টার। উনি বসে থাকে ৫০ ৬০ জন মিলে একটা আপোষ করে দিছে পাহাড়পুর স্কুলে বসে। লাস্টে ১৫হাজার টাকা দিবা চায়। এর মধ্যে ৩হাজার টাকা নাস্তাপানি করাতে গেছে। 

কেন ঐ ৩ হাজার টাকা খরচ দিলেন জানতে চাইলে,তিনি বলেন, ঘুরতেছে দেওয়া লাগবে ওযি হিমু সাংবাদিক নিছে। ২হাজার টাকা ওই নিছে। তাই উঠপে না।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আফসার আলী ক্ষোভ নিয়ে বলেন, “এক প্রতিবন্ধী নারীর ভাতার টাকা আত্মসাৎ কোনো সাধারণ অন্যায় নয়। এটি তার বেঁচে থাকার আশাকে চুরি করা।”

আরেক বাসিন্দা নুরুল হোসেন বলেন,“যে শিক্ষক তার ছাত্রদের মানুষের মতো মানুষ তৈরি করবেন, তিনিই যদি এমন করেন তাহলে সমাজ কোথায় যাবে।মানবিক সমাজে অমানবিকতার এমন নির্মম দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা যায়।। 

এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক ও পাহাড়পুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ- সভাপতি মিজানুর রহমানকে মুঠোফোনে পাওয়া গেলেও তিনি শুধু বলেন“মুঠোফোনে কিছু বলা যাবে না, সাক্ষাতে কথা বলবো। তারপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

অপরদিকে মহিলা সদস্য তহমিনা দাবি করেন,“ভুল করে এমনটি হয়েছে। এখন সংশোধন হয়েছে। তাছাড়া আমার স্বামী মুক্তার সঙ্গে বিষয়টি মিমাংসা করেছে।”

উপজেলা সমাজসেবা অফিসার বলেন,“এটি স্পষ্ট অনিয়ম। আমরা মোবাইল নম্বর সংশোধন করেছি। আবেদনকারীকে নিজের নগদ নম্বর ব্যবহারের পরামর্শ সবসময় দেই।”

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান ছনি জানান,“এ বিষয়ে এখনো লিখিতভাবে কোন অভিযোগ পাই নি। আপনার কাছ থেকে প্রথম শুনলাম। যদি সত্য হয় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এলাকাবাসী মনে করছেন একজন শিক্ষক তিন বছর ধরে ভাতা তুলে থাকলে, এমন ঘটনা আরও থাকতে পারে। তদন্ত শুরু হলে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তাই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন তারা।