জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে হৃদরোগ। রয়েছে স্বাভাবিক জন্মদান, সিজারিয়ান, হার্নিয়া অপারেশনও। এসব রোগ নিয়ে ২৪ ঘন্টা অনরগল হাসপাতালে আসছেন রোগীরা। রোগীর তুলনায় হাসপাতালের জনবল-অবকাঠামো কম হওয়ায় চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। দুর্ভোগ বাড়ছে রোগীরও।
গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলছে এমন পরিস্থিতি। দুর্ভোগ লাঘবে হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যে উন্নীতের দাবি চিকিৎসক ও রোগীদের। হাসপাতাল সূত্র বলছে, ২০০৯ সালে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্য থেকে ৫০ শয্যে উন্নীত করা হয়। সুযোগ সুবিধা বাড়ায় তখন থেকেই রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। ভৌগলিক কারণে আশপাশের সিংড়া, তাড়াশ, চাটমোহর ও বড়াইগ্রামের বৃহৎ একটি অংশ এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। ফলে হাসপাতালটি ৫০ শয্যের হলেও রোগীর আনাগোনা হয় ১০০ শয্যের বেশি।
হাসপাতালের হিসেব বলছে— জুন ২০২৪ থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে জরুরী, ভর্তি ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার ৫১৯ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সময়ে আল্ট্রা করিয়েছেন ২ হাজার ৬০০। এছাড়া ইসিজি ২২৬৩ ও বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা করিয়েছেন ১২ হাজার ৬৪৫ জন রোগী। তবে ৩৫৯টি এক্সের পর অকেজো হয়ে পড়ে আছে পুড়নো এক্স-রে মেশিন। হিসেব মতে, এই সময়ে হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়েছে অন্তত ২০০ প্রসূতির। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দিয়েছেন ৬০০জন প্রসূতি।
নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন সেবীকা (নার্স) বলেন, প্রতি মাসে ১ হাজার থেকে ১হাজার ৫০০ পর্যন্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকেন। ডায়রীয়া বা ঠান্ডাজণিত রোগের প্রকোপ বাড়লে হাসপাতালের বাড়ান্দায় রোগীদের বিছানা দিতে হয়।
তারা বলেন, হাসপাতালে ওষুধ এবং জনবল বরাদ্দ রয়েছে ৫০ শয্যের। কিন্তু রোগী বাড়ায় একই জনবল নিয়ে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। অনেক সময় সরকারি ওষুধ সংকট পড়ায় রোগীর স্বজনদের কাছে তিরস্কারের শিকারও হতে হচ্ছে। তারা চান রোগীর কথা বিবেচনায় এনে এই হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যে উন্নীত করা হোক।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানিয়েছে, ৫০ শয্যের এই হাসপাতালে মোট ২৮ জন চিকিৎসকের পদ রয়েছে। হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়লেও সপ্তাহে দুইদিন হাসপাতালে রোগী দেখছেন হৃদরোগ, মেডিসিন, নাক-কান-গলা, গাইনী ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাছাড়া ইউনানি চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে ডেপুটেশনে আছেন। পর্যাপ্ত সেবীকা (নার্স) থাকলেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জনবলও সংকট রয়েছে।
মেডিকেল অফিসার অহিদুজ্জামান রুবেল, চৈতি মুন্সি, রাজিব হোসেন বলেন, একজন চিকিৎসক প্রতিদিন অন্তত শতাধিক রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। বেশিরভাগ দিনেই দুপুর ৩টা পর্যন্ত রোগী দেখতে হচ্ছে। এছাড়া সিজারিয়ান অপারেশন রয়েছে। এতো রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। ৫০ শয্যের এই কাঠামো বদলে হাসপাতালটিকে ১০০ শয্য করার দাবি চিকিৎসকদেরও।
মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ লাইন। আন্তঃবিভাগেও শয্য না থাকায় মেঝে এবং বাড়ান্দায় রোগীদের বিছানা দেওয়া হয়েছে। এনসিডি কর্ণারেও শ দুয়েক রোগী উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিকের চিকিৎসা নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন।
তাড়াশ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আনোয়ারা বেওয়া ও বড়াইগ্রামের আমেনা বেগম, সিংড়ার গুটিমহিষমাড়ির সেলেনা আক্তারসহ অন্তত ২০ জন রোগী ইত্তেফাককে জানান, আশপাশের অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় এখানে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায়। একারণে তারা অনেক সকালে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কষ্ট হলেও চিকিৎসা নিয়ে ফিরবেন। তবে রোগীদের স্বার্থে চিকিৎসক ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোর দাবি করছেন তারা।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আলমাস হোসেন বলেন, সীমিত জনবল নিয়ে বৃহৎ পরিসরে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। অন্য হাসপাতাল থেকে অ্যানেসথেশিয়া এনে সিজারিয়ান অপারেশন চালু রেখেছেন তিনি। সার্বিকভাবে রোগীর চাপ বাড়ায় চিকিৎসকরা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে হাসপাতালটি ১০০ শয্যে উন্নীত করা উচিত।