বিগত সময়ের অভিজ্ঞতা থেকেই বলা হচ্ছে নতুন ভাইরাস নিয়ে বিশ্ব কি আরও একবার চিন্তিত হতে পারে? নাকি কপালে ভাজের কারণ হতে পারে এই নতুন ভাইরাস। কেননা করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পাঁচ বছর পর ফের ওই চীন থেকে উৎপত্তি হলো নতুন ভাইরাস এইচএমপিভি।
বর্তমানে চীনে এইচএমপিভি ভাইরাস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। চীনে নতুন করে উদ্বেগের কারণ হতে পারে এই ভাইরাসটি।
এই চীন থেকেই কোভিড—১৯ ভাইরাসের সংক্রমনে বিশ্বব্যাপী মহামারী দেখা দিয়েছিল। ওই মহামারিতে পৃথিবীতে ৭০ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিলে। বলা হচ্ছে চৌদ্দ বছর এবং তার কম বয়সীদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ছে। ভীড় বাড়ছে চীনের হাসপাতালগুলোতে। তবে এইচএমভি ভাইরাসের ব্যাপারে এ রকম তথ্য নাকোচ করে দিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা। এই ভাইরাসটি সম্প্রতি ভারতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
এইচএমপিভি কি নতুন ভাইরাসঃ
রাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল এন্ড টিডিসি বলেছেন— প্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত হয় কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন হয়তো আরো অনেক আগে থেকেই এই ভাইরাসের অস্তিত্ব ছিল পৃথিবীতে।
তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন অন্য কথা। তারা বলছেন এই ভাইরাস নিয়ে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কেননা চীনের সরকার বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কেউই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক সতর্কতা জারি করেননি।
এটি কি বিপজ্জসক আকার ধারণ করবে কি না সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতাঃ রোগটি যাতে না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। এইচএমপিভি সংক্রমিত হলে সাধারণত জ্বর বা এর উপসর্গ হিসেবে দেখা যেতে পারে কাশি, জ্বর, নাক বন্ধ এবং শ্বাসকষ্ট হতে পারে। চামড়ায় দানা দেখা দিতে পারে। তবে কারোএই উপসর্গ মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে যেকোনো বয়সী মানুষের ব্রংকাইটিস বা নিউমোনিয়ার মত অসুখ হতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটি ছয় বছরের শিশু ও চৌদ্দ বছরের বয়সী মানুষর মধ্যেই এর লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। এটি তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যে আক্রান্ত হলে ঠিক কতদিন ভুগবেন একজন মানুষ তা নির্ভর করে আক্রান্ত ব্যক্তি শারীরিক সক্ষমতার উপর।
এইচএমপিভি সাধারণত আক্রান্ত মানুষের হাসি বা কাশি থেকে ছড়ায়। এছাড়া আক্রান্ত ব্যাক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এটি ছড়াতে পারে। বস্তু বা স্থানে স্পর্শ কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির হাছি বা কাশির ড্রপলেটে লেগে থাকায় স্থানে যেমন দরজার হাতলে, লিফটে, ইত্যাদি আক্রান্ত স্থানে স্পর্শ করার পর ছড়াতে পারে। অনেকটা কোভিডের মত সাধারণত শীতের সময় বাড়ে। শিশু ও বয়স্করা কেন বেশি আক্রান্ত হয় একজন মানুষ একাধিকবার এইচএমপিভি আক্রান্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন— প্রথমবা সংক্রমনের তীব্রতা বেশি থাকে এরপর শরীরে এক ধরনের বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় যার ফলে পরবর্তী সংক্রমণের তীব্রতা তত বেশি হয় না। ব্যতিক্রম হতে পারে যদি আক্রান্ত ব্যক্তির ক্যান্সার বা দীর্ঘমেয়াদী কোনো অসুখ থাকে।
আতঙ্কিত হওয়া নিয়ে বাংলাদেশের ভাইরোলজিস্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডিজিজ জানিয়েছে, এইচএমপিভি নিয়ে এখনো আতঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ নেই। ২০০১ সালে প্রথম এই ভাইরাস সনাক্ত হয় এবং বাংলাদেশের ২০০৬ এবং ২০০৭ সালের দিকে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল।
বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মাহবুব জামিল বলছেন— কোভিডে ফুসফুসের যতটা ক্ষতিগ্রস্ত করে এইচএমপিভি তে ততটা ক্ষতি হয় না। তিনি জানিয়েছেন শিশু বয়স্ক, গর্ভবতী বা কঠিন কোন রোগে আক্রান্তদের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমন হতে পারে। কেননা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অপেক্ষাকৃত দুর্বল মানুষের ক্ষেত্রে সব সময় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
জেনে নিন এইচএমপিভি বিষয়ে আরো কিছু তথ্যঃ
এইচএমপিভি কোভিড—১৯ এর মত একই পরিবারে ভাইরাস নয় অর্থাৎ করোনা ভাইরাসের টিকা নেয়া থাকলেও বা আগে কখনো কোভিড হলেও আপনার এইচএমপিভির সংক্রমণ হতে পারে। আপনাকে কোভিডের টিকা সুরক্ষা দেবে না।
হল্যান্ডসের গবেষকরা শিশু ও শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমনের নমুনা পরীক্ষা করার সময় প্রথম ভাইরাসের ব্যাপারে জানতে পারেন। এই ভাইরাস অন্তত ৬০ বছর আগেই ছড়িয়েছে। এইচএমপিভি শীতজনিত স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন। দুই থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায় তবে লক্ষণ তীব্র হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি হতে পারে।
এর প্রতিরোধের কি ব্যবস্থাঃ
কোভিড মোকাবিলায় যেসব সর্তকতা নেয়া হয়েছিল এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদক্ষেপে এবং এই ভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেমন বাইরে গেলেই মাকস পড়া। ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান পানি দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোঁয়া। আক্রান্তদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা। জনঘন পরিবেশ এড়িয়ে চলা, হাচি দেয়ার সময় মুখে টিস্যু দিয়ে মুখ ঢেকে দেওয়া এবং ব্যবহৃত টিস্যু সাথে সাথে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে হাত সাবান পানিতে ধুয়ে ফেলা।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া পাশাপাশি পরিমাণ পানি ও শ্বাস—প্রশ্বাসের ব্যায়াম করা। অন্যান্য ভাইরাস প্রতিরোধে কয়েকটি টিকা তৈরি করা হলেও এইচএমপিভি প্রতিরোধী এখনো সে ধরনের কোন টিকা নেই। তাই সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। চিকিৎসা কি জন্য বর্তমানে কোন নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাস ওষুধ নেই। সাধারণত এর লক্ষণ বুঝে তা উপশমের চেষ্টা করবেন যেমন জ্বর হলে তাপমাত্রা কমানো ওষুধ দিন, সর্দি, গলা ব্যাথা ও শ্বাস নিতে সমস্যা হলে সে অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ নিতে হবে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগীকে বিশ্রাম পুষ্টিকর খাবার খাওয়া ও প্রচুর পানি জাতীয় ও খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
মুক্ত/কেএ