ঠাকুরগাঁও সদরের ঢোলারহাট ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের বাসিন্দা আমির হোসেন। গাড়িতে মালামাল লোড-আনলোডের কাজ করতেন তিনি। সেখান থেকে যে অর্থ উপার্জন করতেন তা দিয়ে কোন মত সন্তান নিয়ে সংসার চালাতেন। হঠাৎ করেই তার শরীরে বাসা বাঁধে ডায়বেটিসসহ নানা ধরনের রোগ। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ না হলে পরে তিনি স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ী আবু সাঈদ নামের ব্যাক্তির কাছে দুবারে ৬০ হাজার টাকা নেয়।
পরে দুই ধাপে নেওয়া ৬০ হাজার টাকা তার কাল হয়ে দাঁড়ায়। সুদ সহ ১ লাখ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করলেও ৬ লাখ টাকার মামলা দিয়েছেন দাদন ব্যবসায়ী আবু সাঈদ। তাছাড়া আমিরের পরিবারকে বিভিন্ন ভাবে হুমকিসহ নানাভাবে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে দাদন ব্যবসায়ী সাঈদের বিরুদ্ধে।
আমিরের মতই আরো অনেকেই সাঈদের জালে পা দিয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন। সুদসহ আসল টাকা পরিশোধ করেও মোটা অংকের টাকা দাবি করে মামলা, পুলিশ দিয়ে হয়রানি, বেঁধে পিটানোসহ নানান রকম নির্যাতনের স্বীকার এলাকার মানুষ। টাকা দেওয়ার আগে ফাঁকা চেকে, স্ট্যাম্প ও জমির দলিল নেয়। পরে সেই চেকে মোটা অংকের টাকা দাবি করে মামলা করেন আবু সাঈদ। তার এমন কর্মকান্ডের জালে আবদ্ধ গ্রামের শতাধিক পরিবার।
ভুক্তভোগীরা হচ্ছেন, উপজেলা ঢোলারহাট ইউনিয়নের উত্তর বোয়ালিয়া গ্রামের রবিউল ইসলামের পুত্র আলমগীর হোসেন। হোটেল ব্যবসায়ী জালাল কয়েক মাস ঢকায় পালিয়ে ছিলেন এবং একই গ্রামের স্বাধীন রায়ের পুত্র গোপাল চন্দ্র রায় ভারত পালিয়ে গেছেন। এছাড়াও মাধবপুর গ্রামের মৃত দুলালের ছেলে শাহা আলমসহ আরো অনেকেই।
ভুক্তভোগী আমির বলেন, আমি অসুস্থতার কারনে সাঈদের কাছে থেকে টাকা ধার নেই। তার হুমকিতে আমি কয়েক মাস বাহিরে পালিয়ে ছিলাম। সুদের টাকা দেওয়ার পরেও আসল টাকার জন্য অনেক চাপ দেয়। পরে আমি জমি বিক্রয় করে আসল টাকা শোধ করলেও তার দাবির শেষ থাকে না। আমাকে ৬ লাখ টাকার মামলা দিছে। অসুস্থ অবস্থায় সারাদিন দিনমজুরের কাজ করে মামলার খরচ চালাই। আমি সাঈদের কাছে ৬ লাখ টাকা নেই নাই। সে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। আমি এটার সুষ্ঠ বিচার দাবি করছি।
ভুক্তভোগী ঢোলোরহাট এলাকার আবুল কালাম বলেন, সমস্যার কারণে আমি সাইদের কাছ থেকে লাভের উপর ৬০ হাজার টাকা নেই। ১ বছরে শোধ করছি ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। মাঝে টাকা ১ থেকে ২ মাস দেরি করে দেওয়ার জন্য সাইদ পুলিশ দিয়ে হুমকী দিয়ে আমাকে হয়রানি করে। এলাকায় সাইদ নামকরা দাদন ব্যবসায়ী।
একই এলাকার আরেক ভুক্তভোগী আনোয়ার বলেন, আমি টাকা নেওয়ার পরে কয়েকমাস সুদ দিতে পারি নাই সাইদকে। টাকা নিছিলাম ৪০ হাজার তার বিপরিতে সুদ দিয়েছি ১ লক্ষ ২০ হাজার। পরে টাকা দিতে পারছিলাম না সেজন্য সাইদ পুলিশ পাঠিয়ে হয়রানী করে। ভয়ে আমি পালিয়ে ছিলাম ৩ মাস। সাঈকে আরো ৬০ হাজার টাকা দিয়ে এখন নিজ এলাকায় দিনমজুরের কাজ করছি। সুদের উপর টাকা নিয়ে আমার পরিবার এখন একবারে সর্বশান্ত হয়ে গেছে।
২০ হাজার টাকা নিয়েছিলাম তার জন্য ৩ লাখ টাকার মামলা দিয়েছে সাইদ আমার নামে রাগে আক্ষেপে কথাগুলো বলছিলেন আলী হোসেন আকবর নামের আরেক ভুক্তভোগী। বিপদে পড়া মানুষের সুযোগ নিয়ে সাঈদ এধনের কাজ করে। আমি সাঈদের বিচার চাই।
।
দাদন ব্যবসায়ি আবু সাঈদের কাছে অভিযোগে সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে গোপন ক্যামেরায় ধারনকৃত কথায় সে স্বীকার করেন ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা পাওনাকৃত ব্যক্তিকে ৬ লাখ টাকার মামলা দিয়েছি। এছাড়াও বিভিন্ন জনকে উচ্চসুদে টাকা দেওয়ার বিষয়ে স্বীকার করেন আবু সাঈদ।
জেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘাপটি মেরে খেটে খাওয়া মানুষদের উপকারের নামে শোষণ করছন দাদন ব্যবসায়ীরা। কেউ ব্যক্তিগত ভাবে আবার কেউ সমবায় সমিতি থেকে অনুমোদন নিয়ে করছেন এমন অমানবিক কর্মযজ্ঞ। নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছে এভাবে শোষণ থেকে মুক্তিতে দাদন ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি সচেতন মহলের।
ঠাকুরগাঁও জেলা সমবায় কার্যালয়ের উপ-সহকারী নিবন্ধক একেএম জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জেলায় ঋণ ব্যবসার সাথে জড়িত নিবন্ধিত সমবায় সমিতি প্রায় চার শত। এছাড়াও নিবন্ধন ব্যতীত দাদন ব্যবসার সমিতি রয়েছে প্রায় সাত শত। যারা কোন ধরনের নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এসব দাদন ব্যবসার বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণ আইনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে পারে। এমন ব্যবসা বন্ধের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জরুরী বলে আমি মনে করি।
ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম দাদন ব্যবসা সম্পর্কে বলেন, দাদন ব্যবসা ধর্মে হারাম ও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমরা অভিযোগ পাইলে বা প্রতারণা করছেন এমন কোন অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
মুক্ত/এসএ