নওগাঁর বদলগাছীতে প্রেমিকের পরিবারের নির্মম নির্যাতনের শিকার ৮ম শ্রেনীর স্কুল ছাত্রী শামীমা(১৫)এখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। স্কুল ছাত্রী শামীমাকে উৎত্যক্ত এবং বাড়িতে এসে জোরপূর্বক ধর্ষন চেষ্টার প্রতিবাদ করায় শামীমার পিতা শামীম হোসেন(৩৮) ও চাচা সুমন হোসেন(৪০) কে মারধর ও স্কুল ছাত্রী শামীমা( ১৫)কে মারধর করে জোরপূর্বক মুখে আগাছানাশক কীটনাশক ঢেলে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৮শে আগষ্ট মঙ্গলবার রাত আনুঃ সাড়ে ১০টার দিকে নওগাঁর বদলগাছীর খোঁজাগাড়ি গ্রামে।
মামলা ও স্থানীয়সূত্রে জানা যায়, বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর ইউপির খোঁজাগাড়ি গ্রামের শামীম হোসেনের(৩৮) স্কুল পড়ুয়া মেয়ে শামীমা আক্তার(১৫)কে একই গ্রামের আব্দুল রশীদের ছেলে নাজমুল(১৮) দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার সময় কু-প্রস্তাবসহ প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল এবং গত ১৫ই আগষ্ট মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে আবারও নাজমুল(১৮) রাস্তায় শামীমাকে একা পেয়ে কু- প্রস্তাব দেয় নাজমুলের প্রস্তাব প্রত্যাখান করিলে সে শামীমাকে অপহরণ সহ বিভিন্ন ভয়ভীতি এবং হুমকি ধামকি দেয়। বিষয়টি শামীমা তার পিতা শামীম হোসেন কে জানালে শামীম হোসেন থানায় একটি অভিযোগ দেন। অভিযোগের ভিত্তিতে থানায় বিষয়টি উভয়পক্ষ বসে মিমাংসা করে। এর জের ধরে গত ২৭শে আগষ্ট মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় দিকে বাড়ি ফাঁকা পেয়ে নাজমুল(১৮) শামীমার বাড়িতে ঢুকে ধর্ষনের উদ্দেশ্য জোরপূর্বক কাপড় চোপড় টেনে হেঁচরে বিবস্ত্র করে এবং আপত্তিকর স্থানে হাত দিলে শামীমার চিৎকারে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসলে নাজমুল(১৮) ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে যায়। বিষয়টি শামীমা তার পিতা শামীম হোসেনকে জানালে সন্ধ্যা ৭.৩০ টার দিকে সন্ন্যাসতলা মোড়ে আব্দুল জলিলের মুদি দোকানের সামনে গিয়ে নাজমুলের ঘটনার ব্যপারে নাজমুলের পরিবারকে জানায়ে বাড়িতে চলে আসলে রাত ১০টার দিকে নাজমুল, নাজমুলের পিতা আব্দুল রশিদ দল বেঁধে দেশীয় লোহার রড়,হাসুয়া নিয়ে অতর্কিত ভাবে শামীম হোসেন (৩৮) উপর হামলা চালায়। শামীমকে বাঁচাতে বড়ভাই সুমন হোসেন(৪০) এগিয়ে এলে তাকেও মারধর করতে থাকে। শামীম ও সুমনের চিৎকারে শামীমা(১৫)এগিয়ে এলে নাজমা বেগম, পারুল বেগম, রিভা আক্তার শামীমার চুলের মুটি ধরিয়া মাটিতে ফেলে কিল-ঘুষি মারধর করে এবং নাজমা বেগম শামীমাকে বলে যে, তুই বিষ খেয়ে মরতে পারিস না বলে নাজমা বেগম সাথে করে নিয়ে আসা ঘাসমারা বিষ শামীমা আকতার এর মুখে ঢালিয়ে দেয়। তখন মারপিটের ডাকচিৎকারে আশে পাশের লোকজন এগিয়ে এলে নাজমুল, নাজমুলের পিতা আব্দুল রশিদ সহ সকলেই পালিয়ে যায়।
ঘটনাস্থল থেকে আহত অবস্থায় শামীমা, শামীমার পিতা শামীম ও শামীমের বড়ভাই সুমন হোসেনকে উদ্ধার করে ২৯শে আগষ্ট বুধবার ভোররাত ১টার দিকে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করায় শামীমার অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য কতর্ব্যরত চিকিৎসক ২৯শে আগষ্ট বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় শামিমা আকতারকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে। এ ঘটনায় সুমন হোসেন(৪০)বাদী হয়ে গত ৯ই সেপ্টেম্বর সোমবার রাতে বদলগাছী থানায় একটি মামলা করে।
সরেজমিনে গত ২৯শে অক্টোবর গিয়ে দেখাযায়, বাড়িতে ঢুকতেই ঘরের সামনে চিন্তিত অবস্থায় শামীম হোসেন(৩৮) ঘরের বাহিরে বসে আছে। ঘরবাড়ি অগোছালো বাড়িতে মহিলা না থাকলে যা হয়।শামীমার কথা জানতে চাইতেই কান্না করে ফেলেন। বলেন ভাই আমার মেয়ে মনে হয় বাঁচবে না।ঘরে ঢুকতেই দেখি স্কুল ছাত্রী শামীমা(১৫) বিছানায় শুয়ে আছে।
ঘটনা জানতে চাইলে কাঁন্না বিজরিত কণ্ঠে শামীমা আক্তার বলেন, আমার পরিবার থেকে নাজমুলের পরিবারকে জানালে প্রথম অবস্থায় কয়েকদিন নিরব থাকলেও বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সময় ১৫ই আগষ্ট মঙ্গলবার দুপুর ২টায় আবারও প্রেমসহ কু- প্রস্তাব দেয় নাজমুল হোসেন। তার প্রস্তাবে রাজি না হলে জোড় করে তুলে নিয়ে যাওয়ার ভয়ভীতি দেখায়। বাধ্য হয়ে বাবা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পরে থানায় বসে নাজমুল হোসেন প্রতিশ্রুতি দেয় আমাকে আর বিরক্ত করবে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা। তারপর ২৮শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে আমাকে বাড়িতে একা পেয়ে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে। আমার চিৎকারে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে এলে নাজমুল পালিয়ে যায়। আমার চাচা সুমন হোসেন ও বাবা শামীম হোসেন এ ব্যপারে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় নাজমুলের পরিবারকে বিষয়টি জানায়।রাত ১০টার দিকে নাজমুলের বাড়ির আত্মীয় দলবেঁধে এসে বাবা,চাচাসহ আমাকে মারধর করে মুখে বিষ দেয়। বর্তমানে আমার অবস্থা খুবই খারাপ। আমি বাঁচতে চাই, তাদের কঠিণ বিচার চাই, আবার বই হাতে নিয়ে স্কুলে যেতে চাই বলেই কাঁন্না শুরু করেন।
স্থানীয় গ্রামবাসীর সাথে শামীমা(১৫) ব্যপারে জানতে চাইলে গ্রামবাসী বলেন, অভাব অনটনের সংসার শামীম হোসেনর। শামীম হোসেনের এক মেয়ে এক ছেলে।ঋণের চাপে শামীমের স্ত্রী টাকা রোজগার করতে বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমিয়েছে। বাড়িতে মা নেই। জীবিকার তাগিদে শামীম হোসেন কিস্তির টাকায় সিএনজি কিনে ভাড়া চালায়। বড়মেয়ে শামীমা(১৫) স্থানীয় সন্যাসতলা নাসরিন সিদ্দিকী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেনীতে পড়ে। গত আন্দোলনের মাসের ২৮শে আগষ্ট মঙ্গলবারে একই গ্রামের আব্দুল রশিদের ছেলে নাজমুল(১৯) সন্ধায় শামীমের মেয়েকে একা পেয়ে জোর জবরদস্তি করার সময় শামীমার ডাকাডাকিতে আমরা এগিয়ে এলে নাজমুল(১৯)পালিয়ে যায়। এরপর রাত ১০টার দিকে নাজমুলসহ তার পরিবারের লোকজন দেশীয় অস্ত্র সহ শামীমের পরিবারের উপর হামলা চালায়। শামীমকে বাঁচাতে শামীমের ভাই সুমন হোসেন এগিয়ে এলে তাকেও মারধর করে। শামীমা এগিয়ে এলে শামীমাকে নাজমুলের মা,ফুফু সহ কয়েকজন মিলে ঘরে নিয়ে মারধর করে। পরে শামীমা(১৫) বলে যে তারা আমাকে বিষ খাওয়াছে। এরপর গ্রামের লোকজন হাসপাতালে নিয়ে যায়।
জানতে চাইলে শামীমা আক্তার এর বাবা শামীম হোসেন(৩৮) বলেন, আমার মেয়ে বর্তমানে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। মাথার চুল উঠে গেছে, শরীর দুর্বল হয়ে গেছে, কিডনি সমস্যাতেও ভুগছে। সবমিলে কঠিন এক পরিস্থিতি পার করছে আমার মেয়েটা। প্রতিনিয়িতই মেয়েকে উত্যক্ত করে বখাটে নাজমুল। সেটার প্রতিবাদ করাই কাল হয়ে দাঁড়ালো। আমি এক অসহায় দিনমজুর। পেটের তাগিদে ঋণ নিয়ে সিএনজি ভাড়া চালিয়ে জীবিকা চালাই। নানাভাবে এখনও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে মামলা তুলে নিতে আর আমরা যেন চুপ থাকি। আমরা সঠিক বিচার চাই। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে ১২ই সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বগুড়া শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা করায়। আবারও সমস্যা হলে ২১শে সেপ্টেম্বর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায় এবং ২৩শে সেপ্টেম্বর চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে আসি। আমার মেয়ের জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
ঘটনার দায়ভার অস্বীকার করে উল্টো নিজেদের পক্ষেই সাফাই করে অভিযুক্ত নাজমুলের বাবা আব্দুর রশীদ বলেন, শামীমাকে আমরা বিষ খাওয়াইনি। তারাই হয়তো তাদের মেয়ের মুখে বিষ দিয়ে আমাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। তবে কিছুটা হাতাহাতি হয়েছে। এ ব্যপারে পার্শবর্তী স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা জামাল হোসেন বলেন, এই নির্মমতার পর তার হাত,পায়ের চামড়া পড়ে যাচ্ছে সেই সাথে মাথার চুলও পড়ে যাচ্ছে। একটি স্বাধীন দেশে এটা কেমন বর্বরতা। এমন ঘটনার সাথে জড়িত সবার কঠিন বিচার দাবি করছি।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বদলগাছী থানা অফিসার ইনচার্জ ( ওসি ) মো.শাহজাহান আলী বলেন, বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এমসির ( মেডিকেলক্যাল রিপোর্ট ) জন্য আবেদন করা হয়েছে। এমসি আসলেই অভিযোগ পত্র আদালতে দাখিল করা হবে।