২৩ আগস্ট, ২০২৪

টাকা দিলেই মিলে ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলের দলিল

ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান। অথবা ৩০ বছরের পুড়নো দলিল মিলছে টাকা দিলেই। এমন অন্তত ৪টি জাল দলিল নিয়ে আদালতে মামলাও চলছে। শুধু জাল দলিল নয় সিএস, এসএ রেকর্ড মোতাবেক ডিগ্রীর ভূয়া কাগজ তৈরির সাথেও সম্পৃক্ত এই ব্যাক্তি।

জাল দলিলপত্র তৈরি চক্রের এই সদস্যের নাম মো. জাহিদ মোল্লা (৬৫)। তিনি গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের চলনালী গ্রামের মৃত ফেলা মোল্লার ছেলে। বৃহস্পতিবার জাহিদ মোল্লাকে অভিযুক্ত করে গুরুদাসপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তার বিক্রি করা জাল দলিলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ৬ ব্যক্তি চলনালী গ্রামের ফারুক সরকার, আফাজ উদ্দিন আলহাজ, স্কুল শিক্ষক বজলার রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, পাঁচশিশা গ্রামের আব্দুস সামাদ, দাদুয়া গ্রামের মনিরুল ইসলাম।

লিখিত ওই অভিযোগে দাবি করা হয়, ১৯৭২ সালের ২৯ মের তারিখের ২২১৯ নম্বর, একই তারিখের ২২১৪ নম্বর, ১৯৬৯ সালের ১১ নভেম্বর তারিখে ২৭৬৩২ নম্বর, ১৯৭০সালের ৩০ ডিসেম্বর তারিখের ৬৬২৮ নম্বর দলিল এবং ১২৬/৬৭ নম্বরের একটি মামলা দেখিয়ে ডিগ্রির জাল কাগজ তৈরি করা হয়েছে। গত তিন বছরের মধ্যে তৈরি করা এসব জাল কাগজ নিয়ে বর্তমানে আদালতে একাধিক মামলা চলছে।

জাল দলিল তৈরির ছলে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চলে। অনুসন্ধানে জাল দলিল তৈরির কথা স্বীকার করে চক্রের সদস্য জাহিদ মোল্লা বলেন, ‘আমি আশপাশের চলনালী, পাঁচশিশা, ধারাবারিষা, সিধুলী, চরকাদহ, দাদুয়াসহ বিভিন্ন গ্রামের অনেক লোককে পাকিস্তান ও ব্রিটিশ আমলের দলিল তৈরি করে দিছি। সবগুলোর মামলা চলছে। পাকিস্তান আমলের দলিলের জন্য ২লাখ ৫০ হাজার আর ব্রিটিশ আমলের দলিল করতে সাড়ে ৩ লাখ টাকা নি’। নাটোরের একটি চক্রের সদস্য হিসেবে দলিল তৈরির কাজ করার কথা জানান তিনি।

অভিযোগকারী ভুক্তভোগি আব্দুস সামাদ বলেন, গুরুদাসপুর পৌর শহরের বাসিন্দা শ্রী রাধা রমন কুন্ডুকে দাতা উল্লেখ করে পাঁচশিশা গ্রামের সমতুল্লা শাহর নামে ১৯৬৯ সালের ১১ নভেম্বর তারিখে ২৭৬৩২ নম্বরের যে দলিল প্রকাশ পেয়েছে-বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। রেজিষ্ট্রি অফিসে খোঁজ নিয়ে ওই দলিলের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। 

তিনি বলেন, তারা রাধা রমন কুন্ডুর কাছ থেকে বিক্রি কবলা দলিল মূলে ভোগ দখলে আছেন। অথচ জাল দলিল দেখিয়ে জমিটি দখলের চেষ্টা করছেন প্রতিপক্ষরা। মূলত ৬৯ সালে ২৭৬৩২ নম্বরের কোনো দলিল রেজিষ্ট্রি হয়নি। অভিযুক্ত জাহিদ মোল্লা টাকার বিনিময়ে দলিলটি তৈরি করে দিয়েছেন।

ভুক্তভোগির ফারুক সরকার বলেন, সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ডে নাম থাকা সত্তেও ১২৬/৬৭ নম্বরের একটি মামলা দেখিয়ে ডিগ্রির জাল কাগজ তৈরি করেছেন অভিযুক্ত জাহিদ মোল্লা। তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলের দলিল তৈরিতে ২ লাখ ৫০ হাজার এবং ব্রিটিশ আমলের দলিল তৈরি করতে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা নেন জাহিদ মোল্লা।

ভূমিহীন আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চলনালী মৌজার আরএস ৮৫ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ১৪৭০, ১৮৩৭ ও ১৮৩৯ নম্বর দাগের সোয়া ২৬ শতাংশ জমি রেকর্ডীয় মালিক আয়েশা বিবি ২০১৩ সালে নাতি মনিরুল ইসলামের কাছে বিক্রি করেন ১৪৬৬ দলিলে। এসব জমির মধ্যে থেকে ২০২৩ সালে ১৮৩৭ ও ১৮৩৯ নম্বর দাগের ৫ শতাংশ জমি ২০৪৪ দলিলে মনিরুলের কাছ থেকে ক্রয় করেন তিনি। বছরখানেক আগে ওই জমিতে বসতবাড়ি নির্মাণের সময় স্থানীয় প্রভাবশালী মুন্নাফ একটি জাল দলিল দেখিয়ে তাকে সরিয়ে দেন। ওই দলিলের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলছে।

স্কুল শিক্ষক বজলার ও আফাজ উদ্দিন আলহাজ বলেন, স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে একের পর এক জাল দলিলপত্র তৈরি করছেন জাহিদ মোল্লা। একারণে গত তিন বছরে এসব জাল দলিল নিয়ে অন্তত ১০ জন আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। তারা জাল দলিল তৈরি চক্রের সদস্য জাহিদ মোল্লা বিচার দাবি করেন।

অভিযুক্ত জাহিদ মোল্লা বলেন, জাল দলিল তৈরি ও বিক্রির সাথে তিনি জড়িত নন। তাকে অন্যায় ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

গুরুদাসপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) উজ্জল হোসেন বলেন, জাল দলিল তৈর বিষয়ে তিনি কোনো অভিযোগ পাননি। পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিবেন।