২৯ আগস্ট, ২০২৩

পেয়ারার  দাম বেশী পাওয়ায় সুদিন ফিরেছে চাষিদের 

পেয়ারার  দাম বেশী পাওয়ায় সুদিন ফিরেছে চাষিদের 

পেয়ারার  দাম বেশী পাওয়ায় সুদিন ফিরেছে চাষিদের- ছবি মুক্ত প্রভাত


ঝালকাঠি জেলার একটি ব্র্যান্ড পণ্য পেয়ারা। স্বরুপকাঠি, বানারিপাড়া ও ঝালকাঠির সিমান্তবর্তি এলাকায় গড়ে উঠেছে ভীমরুলির ভাষমান পেয়ারা বাজার। জেলা শহর থেকে কীর্ত্তিপাশা জমিদার বাড়ি হয়ে সড়ক পথে ১৫ কিলোমিটার দূরত্ব ভীমরুলির ভাষমান পেয়ারা বাজার। ঝালকাঠি থেকে সরাসরি অটো রিকসা, রেন্ট মটর সাইকেলে যাওয়া যায় এখানে। আবার নৌ পথে ট্রলার ভাড়া করে এখানে আসার সুযোগ আছে। মৌসুমের আষাঢ়, শ্রাবন, ভাদ্র (জুলাই, আগষ্ট, সেপ্টেম্বর) ৩ মাস জমজমাট থাকে বাজারটি।

এ বাজার কেন্দ্র করে এলাকার শতশত মানুষের একদিকে যেমন উপার্জনের পথ খুলেছে। তেমনি চাষিদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। এক সময় পাইকারদেও কাছে স্বল্প মূল্যে আগাম বাগান বিক্রি করে দিতে হতো চাষীদের। ঝালকাঠি সদর উপজেলার ২১ গ্রামে শতশত বছর ধরে পেয়ারার ফলন হচ্ছে। পাইকার আড়তদ্দার ও চাষিদের সাথে কথা বলে জানাযায় মৌসুমের এ ৩ মাসে অন্তত ৩০ কোটি টাকার পেয়ারা কেনাবেচা হয় ভীমরুলির ভাষমান বাজারে। ঝালকাঠির ভীমরুলিতে দেশের সবচেয়ে বড় এ ভাষমান পেয়ারা বাজার।

ভাষমান বাজারকে কেন্দ্র করে ঐ এলাকার প্রায় ১ হাজার নারী পুরুষের আয়ের পথ এবং কর্মসংস্থান হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পর্যটকদের নিয়ে নৌকায় বাগান দেখানো মাঝি সুশান্ত বড়াল জানায়, আমারা এখানে আসা পর্যটকদের নিয়ে বাজার ও বাগান ঘুরিয়ে দেখাই। সিরিয়াল করে নৌকা ও ট্রলার চালিয়ে তাদের ১ ঘন্টা ঘুরিয়ে দেখালে ৩শ থেকে ৫শ টাকা পাই। ডুমুরিয়ার পেয়ারা বিপুল মন্ডল জানান, আগে আমাদের এলাকার শতশত বেকার যুবকরা কাজ পেতনা।

এই ভাষমান বাজরকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে গাছ থেকে পেয়ার পারার জন্য শ্রমিকদের মজুরী এখন বেড়ে গেছে। আগে একজন শ্রমিকের মজুরি ছিল ৫শ টাকা। এখন তা বেড়ে ৭ থেকে ৮শ টাকা হয়েছে। তাও পাওয়া যায়না। 

গত ২৪ আগষ্ট ঝালকাঠির ভাষমান বাজারে গিয়ে দেখা যায় পেয়ারা মন বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা। যা গত বছর ছিল ৫০০ টাকা। পেয়ারার সাথে চাষিরা আমড়া, নারকেল, কাকড়োল, লেবু, কচু, পেপে, কাঁচাকলা নিয়ে আসছে এ বাজারে। ভাষমান বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পর্যটকদের জন্য মালিকানাধিন পার্ক। খালের ভিতরে খুটি দিয়ে বাশের মাচার হোটেল। ভাষমান বাজারে এরকম একটি হোটেলে বসে ভাত খেতে খেতে পাইকার কাইয়ুম শেখ বলেন, প্রতিদিন এই হাট থেকে ৫/৬শ মন পেয়ারা কিনছি।

এক সময়এখানকার পেয়ারা সংগ্রহ করে লঞ্চে ঢাকায় পাঠাতাম। সেখান থেকে যেত বিভিন্ন জেলায়। এতে পেয়ারা পচে নষ্ট হওয়ায় আমরা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি বছরের পর বছর। এখন এ অঞ্চলের সাথে সড়ক পথের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। অপরদিকে পদ্মা সেতু চালু হবার পর থেকে ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভন্ন জেলায় দ্রæত সময়ে পেয়ারা পৌছে যাচ্ছে।

ডুমুরিয়া  গ্রামের অপর এক পেয়ার চাষী লিটন বেপারী বলেন, খড়ার কারণে গত মৌসুমের চেয়ে এবার ফলন কম। ফুল ধরার সময় অনাবৃষ্টির কারণে বেশির ভাগ পুড়ে যায়। গতবার ৪ বিঘা জমিতে ৩শ মন ফলন পেয়েছি। এবার ১২০ মন ফলন হতে পারে। তবে এবার ফলন কম দাম বেশি। গত মৌসুমে পেয়ারার মন ছিল ৫শ টাকা। এবার মন বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়। 
ডুমুরিয়া বাজারের ছোট পাইকার মোস্তফা মিয়া জানায়, প্রতিদিন এ বাজার থেকে প্রায় ৩শ মন পেয়ারা বেচা কেনা হচ্ছে । পচনশীল এ পেয়ারা দ্রুত বাজারজাত করতে সড়ক পথের সুবিধা হওয়ায় সময় ও যাতায়াত খরচ সাশ্রয় হচ্ছে। ভীমরুলি বাজারের আড়ৎদ্দার তন্ময় হালদার বলেন, প্রায় ২৫ বছর  এ বাজারে আড়ৎদ্দারি করছি।

চলতি মৌসুমে কমপক্ষে প্রায় ৩ হাজার মন পেয়ারা বেচাকেনা হবে। ভীমরুলি ভাষমান বাজারে ডিঙি নৌকায় পেয়ারা নিয়ে আসা চাষী বিশ^জিৎ মিস্ত্রি বলেন, আড়াই বিঘা জমিতে আমি পেয়ার আবাদ করেছি। ২শ মন ফলন হয়েছে। যা বাগানে বসে পাইকারা ৩০ হাজার টাকা দর বলেছে। কিন্ত তাদের না দিয়ে এখন পর্যন্ত বাজারে এনে ৮০ হাজার টাকা বিক্রি করেছি। আরো ১০/১৫ হাজার টাকার পেয়ারা বিক্রি করতে পারব। ভাসমান বাজারের আরেক পাইকার রবিন হাওলাদার জানালেন, বছরের প্রতি আষাঢ়, শ্রাবন ও ভাদ্র ৩ মাসে প্রায় ৩০ কোটি টাকার পেয়ারা কেনা বেচা হয়। এখানে ২শ পাইকার প্রতিদিন পেয়ারা কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বেনাপোল, সিলেট, যশোর, মাইমনসিংহসহ বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করে। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ঝালকাঠি জেলারসদর উপজেলার ডুমুরিয়া, ভিমরুলী, কাফুরকাঠি, ইন্দুরকাঠি, শতদশকাঠি, জগদীশপুর, রামপুর, খেজুরা, বৈরমপুর, খোরদপাড়া, বেশাইনখান, মিরাকাঠি, শংকরধবল, হিমানন্দকাঠি, পাঞ্জিপুঁথিপাড়াসহ ২১টি গ্রামে প্রায় ৯শ হেক্টর জমিতে পেয়ারা আবাদ হচ্ছে। গত বছর ২০২২-২৩ মৌসুমে এখানে ৬ হাজার ৪২ মেট্রিক টন পেয়ার উৎপাদন হয়েছে।

এ বছর ফলন কম হবার কারণে উৎপাদন কম হবে। ঝালকাঠিসহ পিরোজপুরের স্বরুপকাঠি ও বরিশালের বানারিপাড়া এলাকার ৩৬টি গ্রামে পেয়ারার এ বাগান গড়ে উঠেছে। উল্লেখিত গ্রামের প্রায় ২শ বছরের পুড়ানো এসব বাগানের ১ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে পেয়ারা উৎপাদন হচ্ছে। তিন উপজেলার প্রায় ৪৫ হাজার কৃষক তাদের উৎপাদিত পেয়ারা ভীমরুলির ভাষমান বাজারসহ আটঘর ও কুড়িয়ানা বাজরে বিক্রি করে থাকে।

এ্যাডভেঞ্চারস আর্চিনামের ইউটিউবার পাকিস্থানের পর্যটক আরশাদ ইকবাল ২৪ আগষ্ট ঝালকাঠির ভীমরুলি বাজার ভ্রমনে এসে তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এখানকার নিঝুম নিরিবিলি বাগান, থেকে থেকে পাখির ডাক, শান্ত পরিবেশ আমার ভ্রমণ পিপাসু মনে এক নৈসর্গিক প্রশান্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়াও ভাষমান এ পেয়ারা বাজার দেখে আমি আমি অভিভূত। ছোট ছোট নৌকায় বাজারে পেয়ারা ও সবজি আনার দৃশ্য আমার মনে কাশ্মিরের অনুভুতি এনে দিয়েছে। তবে এখানে আসা পর্যটকদের খবারের ওয়ান টাইম প্লেট, প্লাষ্টিকের বোতলসহ বিভিন্ন বর্জ্য ফেলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করা হচ্ছে। যে বিষয়টি আমার খুবই খারাপ লেগেছে। এ বিষয়ে পর্যটক ও স্থানীয় জনসাধারনের সচেতনতাসহ প্রশাসনের কঠোর ভ‚মিকা নেয়া দরকার।  

ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত উপপরিচালক ইসরাত জাহান লিলি বলেন, আমরা ঝালকাঠির এ সম্পদকে আরো কার্যকর করতে আপ্রান চেষ্ঠা করে যাচ্ছি। তবে বৈশি^ক আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এখন পেয়ার চাষিদের চিন্তা ধারার পরিবর্তন আনতে হবে। তাই আমরা সার্বক্ষনিক বাগান পরিদর্শন করে নজরদারি করছি। চাষিদের প্রশিক্ষনের পাশাপাশি নির্দেশনা দিচ্ছি ফুল আসার সময় বৃষ্টি না হলে সেচ দেয়ার। একই সাথে যুগের পর যুগ ধরে এসব বাগানে পেয়ারা গাছ ও জমির ধারণক্ষমতা বাড়াতে সার প্রয়োগের পরামর্শ দিচ্ছি। পোকা দমনে স্প্রে করাও জরুরী।