২৯ অক্টোবর, ২০২৬

ছাত্রদল নেতা হত্যায় এমপি আজিজের ছেলে মিন্টু গ্রেফতার, ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর

ছাত্রদল নেতা হত্যায় এমপি আজিজের ছেলে মিন্টু গ্রেফতার, ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর

ছাত্রদল নেতা শাকিল (৩২) হত্যায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন নাটোরের গুরুদাসপুর আমলী আদালত। মঙ্গলবার বিকেল ৫ টার দিকে তাকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত ওই আদেশ দেন।

হত্যা মামলার রিমান্ড প্রাপ্ত আসামি হলেও আদালত থেকে বের করার সময় এমপিপুত্র মিন্টুর হাতে হাতকড়া পড়ায়নি পুলিশ। পরে তাকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিব) হেফাজতে নেওয়া হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক আসমাউল হক বলেন, হত্যা মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামির বিরুদ্ধে দশ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষের আদালত আসামি মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড মনজুর করেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার বরাত দিয়ে নাটোর জজ কোর্টের আইনজীবী মুক্তার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আদালতে আসামীর পক্ষের কোন আইনজীবী ছিলেন না। তবে আসামি নিজেই শুনানি করার জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চান। আদালত অনুমতি দিলে মিন্টু বলেন, তিনি এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত নন। পুলিশ কোন কিছু যাচাই না করেই তাকে গ্রেফতার দেখিয়েছে। তিনি সঠিক তদন্ত চান। এ সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডটি চাঞ্চল্যকর। প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় আসামির বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তি সাক্ষ্য দিতে সাহস পাচ্ছেন না।  হত্যার সঠিক রহস্য উদঘাটনের জন্য আসামিকে ১০ দিনের রিমান্ড নেওয়া দরকার। এই সময় আদালত উভয় পক্ষের শুনানির পর আসামি মিন্টুর বিরুদ্ধে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এরআগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত দশটার দিকে গুরুদাসপুর বাজার সংলগ্ন ভাড়া বাড়ি থেকে মিন্টুকে আটক করে গুরুদাসপুর থানা পুলিশ। 
পরে মঙ্গলবার দুপুরে তাকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। নুরুজ্জামান মিন্টু গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়কের পদে রয়েছেন।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সোমবার দিবাগত রাতে থানা পুলিশ মিন্টুকে আটক করে রাত ১২টার দিকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করে। জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে মিন্টুকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালতে রিমান্ড মঞ্জুর করার পর আসামি মিন্টুকে আবারো ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

নিহত শাকিল ইসলাম গুরুদাসপুর পৌরসভার খামারনাচকৈড় খোয়ারপাড়া এলাকার রবিউল করিমের ছেলে। তিনি গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব ছিলেন। দুর্বৃত্তরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করেছিলেন। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাত নামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা করেছিলেন তার বাবা রবিউল করিম। সেই মামলাতেই নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

রাজনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসার পর সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে মারা যান। মৃত্যুর খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর ওই হাসপাতালেই কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতির নেতৃত্বে এমপি আবদুল আজিজকে অবরুদ্ধ করা হয়।

সেখানে তার বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতার ও নিহত শাকিলের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান নেতাকর্মীরা। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই রাত দশটার দিকে মিন্টুকে আটক করে মধ্যরাত পর্যন্ত গুরুদাসপুর থানায় ওসির কক্ষে বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবদের জন্য রাতেই তাকে নাটোর জেলা ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। তবে এসব ঘটনার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মঙ্গলবার সকালে শাকিলের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে যান নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। এসময় তিনি বলেন, অপ্রত্যাশিত এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সন্তান জড়িত থাকলেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।

এ সময় সংসদ সদস্য ও ওসির উপস্থিতিতে নিহত শাকিলের পিতা রবিউল করিম অপরাধীদের গ্রেফতারে পুলিশের অবহেলার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে আসামি ধরতে পুলিশের চরম অবহেলা ছিল। স্থানীয় নেতা কর্মীরাও এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখেননি।  তিনি মামলার এজাহারে নাম উল্লেখ করে দিলেও এজাহারটি অজ্ঞাতনামা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কায় থানায় জিডির পর ফেসবুক পোস্ট দেন শাকিল
গত ২০ এপ্রিল ছাত্রদল নেতা শাকিল নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। ওই পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমি আমার জীবন নিয়ে সংশয়ে আছি খুবই। আমাকে মারার জন্য এক বড় ভাই বিভিন্ন চক্র ও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করতেছে। যারা আমাকে মারতে পারবে, তাদের নাকি অনেকগুলো টাকা দেওয়া হবে। এই বিষয়ে আমি ওসির সঙ্গে কথা বলে থানায় একটা ডাইরি (সাধারণ ডায়েরি) করেছি এবং তাদের নাম উল্লেখ করা আছে। আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে এই ডায়েরি (জিডি) অনুযায়ী মামলা করে দেবেন।’

জীবদ্দশায় দেওয়া শাকিলের ওই ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক নজরুল ইসলাম কোন মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, সবকিছু চিন্তা করেই শাকিল হত্যার তদন্ত চলছে। 

শাকিলের পিতা রবিউল ইসলাম বলেন, হুমকি পাওয়ার পর তার ছেলে থানায় জিডি দিয়েছিলেন।  অথচ শাকিলকে রক্ষা করতে পারেনি পুলিশ। আবার খুন হওয়ার পরও অপরাধী ধরতে পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ছিল। ছেলে হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান তিনি।

এমপির দুই ছেলের দুই গ্রুপ
স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টু গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদকের পদে আছেন। ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগ উপজেলা বিএনপি'র সাবেক সহসম্পাদক ছিলেন। এমপির দুই পুত্রের পৃথক দুটি গ্রুপ ও সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্বও আছে। নিহত ছাত্রদল নেতা শাকিল এমপির ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগের অনুসারী ছিলেন।

সেদিন যা ঘটেছিল
পুলিশ ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন ছাত্রদল নেতা শাকিল। এ সময় শাকিলকে কুপিয়ে জখম করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যান হামলাকারীরা।

সেদিন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বেডে শুয়ে শাকিল বলেছিলেন, চাঁচকৈড় বাজার থেকে রাত ৯টার দিকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। বাজারপাড়া এলাকার নুর একাডেমির কাছে পৌঁছালে হেলমেট পরা দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলি থেকে বাঁচতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। গুলি গায়ে না লাগায় দুর্বৃত্তরা তার পেছনে ধাওয়া করে। একপর্যায়ে পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দুলাল সরকারের বাড়ির সামনে আসলে দুর্বৃত্তরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করেন। এ সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসার আগেই মোটরসাইকেল নিয়ে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যান।

প্রত্যক্ষদর্শী সুমন রহমান জানান, বাজারপাড়ার শহীদা জলিল স্কুলের কাছে পর পর দুটি গুলি শব্দ শুনতে পান তারা। এগিয়ে যেতেই শাকিলকে দৌড়ে চলে যেতে দেখেন। পেছনে মোটরসাইকেল নিয়ে ধাওয়া করে দুই ব্যক্তি। কিছুক্ষণ পর রক্তমাখা অস্ত্র নিয়ে হামলাকারীদের ফিরতে দেখেন। পরে শহীদা জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে চিৎকার করছিলেন শাকিল। তারা শাকিলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

গুরুতর আহত অবস্থায় শাকিলকে উদ্ধার করে প্রথমে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে পাঠানো হয়।

গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক নওশিন জাহান বলেন, ‘গুরুতর অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত করা হয়। শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় চিকিৎসা শেষে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।’

যুবদল নেতা ইসরাফিল শেখ বলেন, ‘হামলার রাতেই রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে শাকিলকে অন্তত পাঁচ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়। এরপর অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অপারেশনের পর অবস্থার অবনতি হলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাকিলের কিডনি আর কাজ করছিল না। শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় ওই হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে নেওয়া হয়। আইসিইউতে রাখার পর লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। সবশেষ সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে চিকিৎসকরা শাকিলকে মৃত ঘোষণা করেন।’

নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার আহমেদ বলেন, চাঞ্চল্যকর এই মামলাটির সঠিক তদন্ত করতে পুলিশের একাধিক কাজ করছে। অপরাধী যত বড় প্রভাবশালী হোক না কেন পুলিশ তাকে ছাড় দেবেনা।

শাকিলের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বিকেল তিনটায় রাজধানীর পল্টন এলাকায় বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে নিহত শাকিলের প্রথম জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর এশার নামাজের পর বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানাজা শেষে তাকে চাঁচকৈড় পুড়ানপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হবে।