শরতের শিশিরভেজা ভোর, দিগন্তজোড়া কাশবনের দোলা আর শিউলির সুবাসেই শুরু হয় দেবীপক্ষের আগমনী সুর। এ রূপ শুধু প্রকৃতির নয়, এ রূপ বাঙালির হৃদয়ের এক অমলিন আনন্দের বার্তা। এই আনন্দ নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আপামর বাঙালির, এটি আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের।
বাস্তবতা হলো, দেশের এক কোটি ৩১ লাখেরও বেশি সনাতন ধর্মাবলম্বী নাগরিক আমাদের এই বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সারাদেশের ৩৩ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপে যখন ঢাকের কাঠি পড়ে, তখন প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কোনো করুণা নয়—এটি তার সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ববোধের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গড়ে উঠেছিল যার হাতে, তিনি স্বাধীনতার ঘোষক ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি প্রথম দেশের মানুষকে শিখিয়েছিলেন, "আমরা সবাই বাংলাদেশি।" এক বাক্যে তিনি দূর করেছিলেন ধর্ম, বর্ণ, পাহাড়ি কিংবা সমতলের কৃত্রিম বিভেদ।
সেই উদার দর্শনের ধারাবাহিকতায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া রমনা কালীমন্দির পুনর্নির্মাণ থেকে শুরু করে মন্দিরভিত্তিক শিক্ষার মতো বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। আর আজ, তারই সুযোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বে সেই অসম্পূর্ণ স্বপ্নকে পূর্ণতা দিয়ে চলেছেন। তাঁর উচ্চারিত প্রত্যয়—“ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার”—আজ আর কেবল কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের আস্থার এক সুদৃঢ় ভিত।
জাতীয়তাবাদ থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তা
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মূল সৌন্দর্যই হলো বহুত্বের মাঝে ঐক্যের পথ খোঁজা। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় বিশ্বাসকে শ্রদ্ধার পাশাপাশি অনুসংখ্যাগুরুর অধিকার ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা রাষ্ট্র পরিচালনা নীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে সেই দর্শনের প্রতিফলন আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই। শুধু দূর থেকে শুভেচ্ছাবার্তায় সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি মাঠপর্যায়ে জনগণের দুয়ারে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন এবং সরাসরি তাদের প্রত্যাশার কথা শোনার এই রাজনৈতিক ধারা সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে।
একই সঙ্গে দুর্গাপূজার ছুটি বৃদ্ধি, সরকারি অর্থ বরাদ্দের স্বচ্ছ বণ্টন এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগগুলো কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচায়ক নয়, এটি এক অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তার প্রমাণ। উৎসবের দিনে সহায়তা দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনই বছরজুড়ে যেন কোনো নাগরিক নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আতঙ্কে না থাকেন, সে পরিবেশ বজায় রাখাই আধুনিক রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য।
মানবতার মূলমন্ত্র ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার
সনাতন ধর্মমতে দেবী দুর্গা শুভশক্তির প্রতীক, যিনি অশুভ ও অন্যায়কে বিনাশ করেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ‘সাম্যের গান’ কিংবা ইসলামের শিক্ষা—সবখানেই মানবতার ঊর্ধ্বে কোনো বিভেদকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি। পবিত্র কোরআনের স্পষ্ট বাণী, “ ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” সুতরাং ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্যের উপাসনালয়ে আঘাত করা কিংবা বিভাজন সৃষ্টি করা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
একটি রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে তৈরি হয় না, তার প্রমাণ মেলে নেতা-কর্মীদের মাঠপর্যায়ের আচরণে। বিএনপি পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আমার প্রত্যাশা—আমাদের রাজনৈতিক পরিচয় যেন মানুষের মনে ভয় নয়, বরং আস্থা, নিরাপত্তা ও সহমর্মিতার বার্তা পৌঁছে দেয়। তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত উসকানি, চাঁদাবাজি বা যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানই একটি আদর্শ দলের পরিচায়ক।
আলোর দিকে আমাদের যাত্রা
মহাজাগতিক এই উৎসবে মা দুর্গার আগমন আমাদের শেখায় অন্ধকারের বুক চিরে আলোর জয়গাথা। শহীদ জিয়ার প্রবর্তিত জাতীয়তাবাদের আকাশ, বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রামের আদর্শ এবং তারেক রহমানের মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তা—এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে উঠছে এক নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে। অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে সব সম্প্রদায়ের সমান অবদান রয়েছে। ফলে এ দেশ কারও একার নয়, এ দেশ প্রতিটি নাগরিকের।
শরতের স্নিগ্ধ আলোয়, ঢাকের প্রদীপ্ত ধ্বনিতে মুছে যাক অতীতের সব বিভেদ, বিদ্বেষ ও গ্লানি। জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই প্রিয় মাতৃভূমি হয়ে উঠুক শান্তিময়, অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যের এক অনন্য তীর্থভূমি।
শারদীয় দুর্গোৎসব ও বিজয়া দশমীতে দেশের সকল সনাতন ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনদের জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শারদীয় শুভেচ্ছা।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট