দেশের কিছু নির্দিষ্ট জায়গা ও কলকারখানায় পরিকল্পিতভাবে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির অপচেষ্টা চলছে বলে স্পষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন, পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার ও সীমান্তের ওপার থেকে এই বিশৃঙ্খলার পেছনে অর্থ জোগান দেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে বিভিন্ন ‘টিকিট বিক্রির চেষ্টা’ করা কয়েকটি রাজনৈতিক দলও।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
শ্রমিক অসন্তোষের নেপথ্য কুশীলবদের ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে, তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে। কাদের সাহায্যে করছে? এই যে কতিপয় দল আছে, যারা ভ্রান্তি ছড়ায় দেশের মধ্যে। তারা বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে। এই দুই পক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।’
সরকার যখন দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, নিরাপত্তা জোরদার করা, বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং কৃষকদের স্বাবলম্বী করার দূরদর্শী উদ্যোগে ব্যস্ত, ঠিক তখনই একটি মহল রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলেও দেশের উন্নয়নকে রুখতে এ ধরনের গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকেও থামিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা সফল হতে দেওয়া হবে না।
মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করা হয়েছে। অথচ ‘জুলাইয়ের চেতনার কথা বলা’ কয়েকটি দলের প্রতিনিধিরা সেই অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, ‘৭১ সালে তারা যেভাবে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছে, ঠিক একইভাবে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনকেও তারা ধোঁকা দিয়েছে। তাদের মুখে এক কথা আর কর্মে অন্য প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।’
এ সময় রাজশাহী অঞ্চলের পানিসংকট নিরসনে পদ্মা ও তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট জানান, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় সরকার সব ধরনের কূটনৈতিক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। জনসভার শুরুতে রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে একযোগে ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা বিতরণ করেন তিনি।
এর আগে দুপুরে রংপুর নগরের ধর্মসভা রাধাগোবিন্দ মন্দির পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে সমবেত পুজারি ও স্থানীয় জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, অতীতের সংঘাত ও বিভাজনের রাজনীতির পতন ঘটিয়ে একটি জনমুখী নতুন রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা করতে চায় বর্তমান সরকার।
রংপুরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বিশাল বরাদ্দ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এমন একটি সরকার হতে চাই, যাঁরা আমাদের ভোট দিয়েছেন—তাঁদেরও সরকার, আবার যাঁরা ভোট দেননি—তাঁদেরও সরকার। দেশের প্রতিটি মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।’
মন্দির পরিদর্শনকালে তিনি শিশু ও স্থানীয়দের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং মন্দিরের উন্নয়নে ১০ লাখ টাকার অনুদান প্রদান করেন। পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে আসা পূজারিদের আবাসন সংকট সমাধানে নির্মাণাধীন অবকাঠামোর কাজ দ্রুত শেষ করতে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়কে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে এবং রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশন প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমানের সঞ্চালনায় জনসভায় আরও বক্তব্য দেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।