কেউ হাঁড়ি পেতেছেন। কেউ ধরেছেন জগ। কেউবা আবার গ্লাস হাতে অপেক্ষায়। শত শত মানুষের এই প্রচেষ্টা পানি সংগ্রহের জন্য। তবে এটি কোনো সাধারণ পানি নয়। ডুমুর গাছ থেকে অনর্গল বের হওয়া গারো তরল পদার্থ।
গারো তরল সেই পদার্থকেই বিভিন্ন রোগের নিরাময়ক হিসেবে ভাবছেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার মাধনগর ও এর আশপাশের গ্রামের বহু মানুষ। গত প্রায় ৭ দিন ধরে মাধনগর ইউনিয়নের বাঁশিলা উত্তরপাড়া গ্রামের সেফাত আলী বাড়ির একটি ডুমুর গাছ থেকে চলছে পানি সংগ্রহের এই তৎপরতা।
কিভাবে ছড়াল এই কথা
সপ্তাহ খানেক আগে গাছটির ডাল কাটছিলেন সিফাত আলী। অন্য ডাল গুলো থেকে আঠা বের হলেও হঠাৎ একটি কাটা ডালের ভেতর থেকে এক ধরনের গাঢ় তরল পদার্থ বের হতে থাকে। কৌতুহল বসত তিনি পাতিলে করে সেই পদার্থ সংগ্রহ করেন। তার ভাষ্য মতে, ওই পদার্থ গাছের কষ নয় বরং পানির মত-তবে গাঢ়। সংগ্রহ করা পানি তিনি রোগাক্রান্ত বৃদ্ধ পিতাকে পান করান। এতেই তার পিতার শরীরিক ব্যাথা থেকে নিরাময় হতে শুরু করে। এই কথা তিনি গ্রামের মানুষের কাছে গল্প করেন। এরপর থেকেই তাদের বাড়ির ওই ডুমুর গাছের পানি সংগ্রহ করতে আসেন গ্রামের মানুষ।
স্থানীয় লোকজন বলেন, ডুমুর গাছের পানি পান করে বিভিন্ন ধরনের রোগ-বালাই ভালো হচ্ছে এমন তথ্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাটি চাউর হওয়ার পর থেকে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বহু মানুষ জগ, মগ, হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে পানি সংগ্রহে ছুটছেন। মানুষ সরল মনে বিশ্বাস করছেন এই পানির ঔষধি গুণ রয়েছে। তাই গাছটির একটি ডালে ২৪ ঘন্টাই পানি সংগ্রহে পাতিল বেঁধে রাখা হচ্ছে।
ডুমুর গাছ নিয়ে বিজ্ঞান কি বলছে
আমাদের অঞ্চলে মূলত দুই ধরণের ডুমুর বেশি দেখা যায়, যার প্রতিটিরই নিজস্ব বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব রয়েছে। মূলত জগ ডুমুর বা যজ্ঞ ডুমুর বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রজাতি। এই গাছের ছাল, পাতা এবং কচি ফল আমাশয়, ডায়াবেটিস এবং প্রদাহজনিত রোগের চিকিৎসায় প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বিজ্ঞানিদের গবেষণায় দেখা গেছে, ডুমুর গাছের ফল, পাতা ও ছালে প্রচুর পরিমাণে জৈব-সক্রিয় উপাদান রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় ডুমুরের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ফার্মাকোলজিক্যাল কার্যকারিতা প্রমাণিতও হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, হজম ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণ, লিভার সুরক্ষায় ডুমুরের নির্যাস লিভারের এনজাইমগুলোর ক্ষরণ স্বাভাবিক রাখতে এবং লিভারের টক্সিন দূর করে।
এছাড়া রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করে। সনাতন ও লোকজ চিকিৎসায় ডুমুরের কাঁচা ফল বা ডাল ভাঙলে যে দুধের মতো সাদা তরল বের হয়। এই তরল নানা চর্মরোগের ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
সরেজমিন ঘুরে
ডুমুর গাছের একটি ডাল থেকে সাদা দুধের মতো গাঢ় তরল বের হচ্ছে। এই তরল সংগ্রহের জন্য হাঁড়ি-পাতিল বেঁধে রাখা হয়েছে। নানা বয়সী অনেক মানুষ ভিড় করছেন সিফাত আলীর বাড়ির উঠনো। অনেকেই আবার গ্রাসে করে ওই তরল পানও করছেন।
নাটোর সদর উপজেলার ভাটোদাঁড়া গ্রামের কাঠ ব্যবসায়ী ইয়াকুব আলী মৃধা জানালেন, ডুমুর গাছ কাটার পানি বের হওয়ার ঘটনা পুরনো। তার দাবী- ডুমুর গাছের ফল আর বাকল থেকে সাদা আঠা বের। সেই আঠা বিভিন্ন রোগের নিরাময়ে ব্যবহারও হয়।
বিশেষজ্ঞদের মত
রাজশাহী কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদা জানান, গাছ থেকে বের হওয়া সবই আঠা। রঙে কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। ডুমুর গাছে ফল, বাকল আর আঠায় নানা ধরনের ঔষধি গুণ রয়েছে। তবে এটি ব্যবহারের যথাযথ নিয়মও আছে। কিন্তু গাছ থেকে পানি বের হচ্ছে, সেই পানিতে রোগ মুক্তি হচ্ছে এই বিষয়টি তিনি নিশ্চিত নন। কোনো ধরনের গুজব বিশ্বাস না করার আহবান তার।
নলডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, মো. জুনায়েদ আহমেদ লেলিন বলেন, গ্রামের সহজ সরল মানুষ অন্ধবিশ্বাসে গাছ থেকে নির্গত পানি পান করছেন এমন খবর তিনি পেয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে এর কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তার কাছে নেই। ডুমুর গাছের পানি সংগ্রহের বিষয়টি অতিরঞ্জিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন তিনি।