১৭ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশের ক্ষমতা-কাঠামো কলোনিয়াল নন্দনতত্ত্বেরই একটা লেজুড়

বাংলাদেশের ক্ষমতা-কাঠামো কলোনিয়াল নন্দনতত্ত্বেরই একটা লেজুড়

মতামত ডেস্ক: বাংলাদেশি শিল্প ও সংস্কৃতির সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা অত্যন্ত জটিল একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলের নানা ঐতিহাসিক পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভাষা আন্দোলনের শিকড় কেবল বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং পাকিস্তান গঠনের বহু আগে থেকেই রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক শুরু হয়েছিল। উনিশ শতকের চল্লিশের দশকে বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিকদের মূল ধারার বাইরে রেখে তথাকথিত ’বাংলা সাহিত্য’ চর্চার যে আহ্বান জানানো হয়েছিল, তার রেশ আজও কোনো না কোনোভাবে সমাজে বিদ্যমান রয়েছে।

আমাদের দেশের মূলধারার মাধ্যম, সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থায় এখনো উপনিবেশিক মানসিকতার প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। এই প্রভাবশালী সমাজ মনে করে, বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো স্বতন্ত্র সংস্কৃতি নেই, বরং যা আছে তা বৃহত্তর বাঙালি সংস্কৃতিরই একটি অংশ মাত্র। অথচ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন এই ভূখণ্ডের অস্তিত্বের পেছনে রয়েছে নিজস্ব এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা। ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে প্রোথিত এই উপনিবেশিক নন্দনতত্ত্বের কারণেই বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে প্রায়শই অস্বীকার করা হয়।

সাংস্কৃতিক আইকন বা প্রতীক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এই উপনিবেশিক ও শ্রেণিভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। শিল্পকলা একাডেমি বা অন্যান্য প্রকাশ্য স্থানে যাঁদের প্রতিকৃতি বা অবদানকে বড় করে দেখানো হয়, তাঁদের প্রায় সবাই ঔপনিবেশিক আমলের ব্যক্তিত্ব। প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বা আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বকে এই পরিসরে সচরাচর স্থান দেওয়া হয় না। এর ফলে মূল উদ্দেশ্য আর যাই হোক, উপনিবেশিক লিগ্যাসি বা উত্তরাধিকারকে জোরপূর্বক টিকিয়ে রাখার একটি সুপ্ত প্রচেষ্টা সবসময়ই কাজ করে।

একইভাবে, মধ্যবিত্ত সমাজের গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক উপযোগিতাও সাংস্কৃতিক আইকন নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় মাপকাঠি হিসেবে কাজ করে। লালন শাহ বা হাসন রাজার মতো লোকশিল্পীরাও সমাজের উচ্চ বা মধ্যবিত্ত স্তরের স্বীকৃতি পাওয়ার পরই মূলধারার আইকনে পরিণত হয়েছেন। অন্যদিকে, রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে মানানসই না হওয়ায় বহু মৌলিক গুণী শিল্পী ও সাধক যথাযথ মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত থেকে যান। এই কাঠামোগত প্রবণতাগুলো চিহ্নিত না করলে বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের উপনিবেশিক ধ্যানধারণা ও শুদ্ধতার গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভাষা বা ধারণাও যে চিরস্থায়ী কোনো স্থির বিষয় নয়, বরং পরিবর্তনশীল—এই সত্যটি মেনে নেওয়া জরুরি। ঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্যকে একমাত্র কেন্দ্র বা মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করার অভ্যাস ত্যাগ না করলে বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প-সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ রূপ কখনোই উন্মোচিত হবে না।