আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল ও পরীক্ষামূলক সংলাপের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যে নতুন ধারা সৃষ্টির স্বীকৃতিস্বরূপ নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কানাডার প্রখ্যাত কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। সুইডিশ একাডেমির পক্ষ থেকে এই আন্তর্জাতিক সম্মাননা ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে সাহিত্যপ্রেমী ও সমালোচকদের মধ্যে ব্যাপক আনন্দ ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রাতিষ্ঠানিক পাণ্ডিত্য এবং স্বাধীন সৃজনশীলতার এক অনবদ্য মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি বিশ্বসাহিত্য অঙ্গনে স্বতন্ত্র এক অবস্থান তৈরি করেছেন। কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং কথাসাহিত্যের প্রথাগত সীমানাকে ভেঙে তিনি এমন এক অনন্য জগত নির্মাণ করেছেন, যা আধুনিক পাঠকদের মনস্তত্ত্বে গভীর রেখাপাত করতে সক্ষম হয়েছে।
কানাডার অন্টারিওর টরন্টোতে জন্ম নেওয়া কারসন ছোটবেলা থেকেই গ্রিক ও লাতিন ভাষার ধ্রুপদি সাহিত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগী ছিলেন। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধ্রুপদি সাহিত্যে স্নাতক থেকে শুরু করে ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে তিনি নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির মজবুত ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। তাঁর এই গভীর প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান পরবর্তী সময়ে তাঁর কাব্যসত্তার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর সাহিত্যকর্মের ওপর ভিত্তি করে রচিত তাঁর প্রথম তাত্ত্বিক গ্রন্থ ’ইরোস দ্য বিটারসুইট’ আন্তর্জাতিক সাহিত্য মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং তাঁকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করে তোলে।
অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে বড় বৈচিত্র্য হলো এটি কোনো নির্দিষ্ট ধারার বা জঁরার ফ্রেমে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকরাসের একটি খণ্ডিত কবিতাকে রূপান্তর করে তিনি লিখেছিলেন ’অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ নামক বিখ্যাত উপন্যাস, যেখানে প্রাচীন দানব গেরিওনকে এক আধুনিক কিশোর আলোকচিত্রী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া তাঁর ’নক্স’ বইটি ব্যক্তিগত শোকের এক দৃশ্যমান কোলাজ শিল্প, যেখানে হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের স্মৃতির সঙ্গে প্রাচীন রোমান কবিতার নানা পঙ্ক্তি ও পারিবারিক ছবি যুক্ত করা হয়েছে। তাঁর এই অভিনব রূপ ও পরীক্ষামূলক আঙ্গিক সমকালীন বিশ্বসাহিত্যে এক বিশাল তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
অনুবাদক হিসেবেও কারসন বিশ্বসাহিত্যে অত্যন্ত উঁচুতলার আসনে আসীন, কারণ তাঁর কাছে অনুবাদ কেবল এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তর নয়, বরং এক স্বাধীন সৃষ্টি। প্রাচীন গ্রিক নাট্যকারদের রচনা বা স্যাফোর ভাঙা টুকরো কবিতা অনুবাদের সময় তিনি শব্দের পাশাপাশি নীরবতা ও শূন্যস্থানগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। সুইডিশ একাডেমি তাঁর এই কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে জানিয়েছে যে তিনি প্রাচীন ট্র্যাজেডি বা পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে বর্তমানের পপ সংস্কৃতি ও সমসাময়িক বাস্তবতাকে চমৎকারভাবে যুক্ত করেছেন। এই নোবেল প্রাপ্তির মাধ্যমে ধ্রুপদি জ্ঞান ও আধুনিক ভাবনার এই অপূর্ব সমন্বয় বিশ্বমঞ্চে আরও একবার সর্বোচ্চ মর্যাদায় ভূষিত হলো।