একসময় এলাকার ছোট্ট মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে বল নিয়ে ছুটতেন রোকন। সেই মাঠেই জন্ম নেয় বড় হয়ে ওঠার স্বপ্ন। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে প্রতিযোগিতার পরিধি, এসেছে সাফল্য ও বড় দলে খেলার সুযোগ। তবে ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গুরুতর ইনজুরি তাঁকে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে ছিটকে দেয়। চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার ও পুনর্বাসনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আবারও ফিরেছেন সবুজ মাঠে। এখন তাঁর স্বপ্ন জাতীয় পর্যায়ের ফুটবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।
মো. রোকনুজ্জামান রোকন (২৪) নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের ধারাবারিষা গ্রামের মো. আব্দুর রহিমের ছেলে। বর্তমানে তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগে অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
ছোট মাঠেই জন্ম নেয় বড় স্বপ্ন
ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি গভীর টান রোকনের। এলাকার বন্ধু ও বড় ভাইদের সঙ্গে খেলতে খেলতেই ফুটবলকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। সপ্তম শ্রেণিতে ধারাবারিষা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় গুরুদাসপুরের ভোরের ডাক ফুটবল একাডেমিতে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন।
রোকন বলেন, “ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি আমার প্রবল ইচ্ছে ছিল। ভালো খেললে সবাই উৎসাহ দিতেন। সেই প্রশংসা আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করত। ধীরে ধীরে ফুটবল আমার ভালোবাসা ও স্বপ্নের জায়গা হয়ে ওঠে।”
গোলেই বাড়ে আত্মবিশ্বাস
ফুটবলজীবনের শুরুর দিকের স্মরণীয় ম্যাচগুলোর একটি নাটোরের তৎকালীন শংকর গোবিন্দ স্টেডিয়ামে, যা বর্তমানে জেলা স্টেডিয়াম নামে পরিচিত। নাটোর সদর উপজেলার আন্তঃইউনিয়ন ফুটবল প্রতিযোগিতায় দীঘাপতিয়া ইউনিয়নের হয়ে খেলেন রোকন। নাটোর রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের গোলাম সারোয়ার পাশার আমন্ত্রণে পাওয়া সেই সুযোগে জয়সূচক গোলটি করেন তিনি।
তাঁর একমাত্র গোলেই দল জয় পায় ১–০ ব্যবধানে। ম্যাচ শেষে পুরস্কার হিসেবে পান ৬০০ টাকা। অর্থের অঙ্কে ছোট হলেও সেই পুরস্কার তাঁর কাছে ছিল বড় অনুপ্রেরণা।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের উদ্যোগে অনূর্ধ্ব-১৫ পর্যায়ের প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রমে অংশ নেন রোকন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৬৪ জেলা থেকে নির্বাচিত ৬৪ খেলোয়াড়ের মধ্যে নাটোর জেলা থেকে একমাত্র নির্বাচিত খেলোয়াড় ছিলেন তিনি।
২০১৯ সালে শেখ কামাল অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় ফুটবল টুর্নামেন্টে রাজশাহী বিভাগের হয়ে খেলার সুযোগ পান। তাঁর দাবি, ওই আসরে রাজশাহী বিভাগ চ্যাম্পিয়ন হয়।
প্রিমিয়ার লিগের দ্বারপ্রান্তে
ফুটবলের পথচলায় চট্টগ্রামের প্রথম বিভাগে শতদল ক্লাব এবং ঢাকার দ্বিতীয় বিভাগে সিদ্দিক বাজার ফুটবল ক্লাবের হয়ে খেলেছেন রোকন। এরপর ২০২১ সালে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের দল আরামবাগ ক্রীড়া সংঘে খেলার সুযোগ পান।
কিন্তু বড় স্বপ্নের পথে তখনই আসে কঠিন বাধা। ২০২১ সালে নাটোরের চানপুর মাঠে খেলতে গিয়ে গুরুতর পায়ের ইনজুরিতে পড়েন তিনি। দীর্ঘ সময়ের জন্য মাঠের বাইরে চলে যেতে হয় তাঁকে।
রোকন বলেন, “আরামবাগে খেলার সুযোগ পাওয়ার পর ইনজুরিতে পড়ে যাওয়া আমার জন্য খুবই কঠিন ছিল। এত বড় সুযোগ পাওয়ার পরও যখন মাঠের বাইরে থাকতে হলো, তখন ভীষণ কষ্ট পেয়েছি।”
দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২০২৫ সালে মিরপুর-৬-এর আলোক হাসপাতালে তাঁর পায়ের ACL অস্ত্রোপচার হয়। এরপর শুরু হয় পুনর্বাসনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া। শেষ পর্যন্ত সেই লড়াই পেরিয়ে আবারও মাঠে ফিরেছেন তিনি।
মাঠে ফেরার অনুভূতি জানিয়ে রোকন বলেন, “দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকার পর আবার খেলতে নামার অনুভূতিটা ছিল অসাধারণ। মনে হয়েছিল যেন পুরোনো সেই জায়গায় ফিরে এসেছি। আত্মবিশ্বাসও ফিরে পেয়েছিলাম।”
এক ম্যাচে হ্যাটট্রিক
রোকনের ক্যারিয়ারের আরেক স্মরণীয় অধ্যায় ২০২০ সালের বড়াইগ্রামের তিরইল মাঠের আন্তঃজেলা ফুটবল টুর্নামেন্ট। ওই ম্যাচে একাই করেন তিন গোল। তাঁর হ্যাটট্রিকেই জয় পায় দল।
রোকনের পছন্দের পজিশন অ্যাটাকিং মিডফিল্ড। প্রিয় ফুটবলার ব্রাজিলের নেইমার জুনিয়র। নেইমারের সৃজনশীলতা, ড্রিবলিং ও আক্রমণাত্মক খেলার ধরন তাঁকে অনুপ্রাণিত করে।
স্বপ্ন এখন জাতীয় পর্যায়ে
ইনজুরি তাঁকে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে রাখলেও স্বপ্ন থেকে দূরে সরাতে পারেনি। নতুন করে মাঠে ফেরার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। লক্ষ্য—নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আরও বড় পর্যায়ে খেলা।
রোকন বলেন, “ভবিষ্যতে একজন ভালো ও আদর্শ ফুটবলার হতে চাই। নিজের পরিশ্রম ও যোগ্যতার মাধ্যমে আরও বড় পর্যায়ে খেলতে চাই। আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন জাতীয় পর্যায়ে খেলা। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য যত বাধাই আসুক, চেষ্টা চালিয়ে যেতে চাই।”
এলাকার ছোট্ট মাঠে বল পায়ে ছুটে চলা সেই কিশোর আজ ২৪ বছরের তরুণ। পথের নানা বাধা পেরিয়ে তাঁর স্বপ্ন এখনো একই—আরও বড় মঞ্চে খেলা, নিজেকে প্রমাণ করা। ইনজুরি তাঁকে থামিয়েছিল, কিন্তু থামাতে পারেনি তাঁর স্বপ্নযাত্রা।