সুরের কোনো সীমানা নেই। সময় বদলায়, মানুষের রুচি বদলায়, বদলে যায় গানের ধরনও। তবু কিছু সুর থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে, শেকড়ের গভীরে। আধুনিকতার ভিড়ে সেইসব গান ও সুরের অনেকটাই আজ আড়ালে। হারিয়ে যেতে বসা সেই সংগীতের চর্চা আবারও ফিরিয়ে আনতে চায় একদল সুরপাগল মানুষ। তাদের সম্মিলিত উদ্যোগের নাম ‘সুরবান’।
সুরবান কোনো প্রচলিত অর্থে শুধু একটি সংগীতদল নয়। সুরকে ভালোবেসে, সংগীতের বিভিন্ন ধারার চর্চা ও পরিবেশনার মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাদের মূল ভাবনা। বিশেষ করে বাংলার মাটিতে গড়ে ওঠা এবং বর্তমানে তুলনামূলক কম চর্চিত গানগুলোকে নতুন করে সামনে আনতে চায় তারা।
নামের পেছনের গল্প
সুরবান’ নামটি হয়তো নতুন, কিন্তু সুরের প্রতি মানুষের ভালোবাসা নতুন নয়। সংগীতের শুরুর দিন থেকেই সুরপাগল মানুষের অস্তিত্ব ছিল—এমন ভাবনা থেকেই নামটির দর্শন।
সুরবানের প্রতিষ্ঠাতা দুর্জয় বড়ুয়া বলেন, “সুরবান মূলত ছিল সংগীতের প্রথম দিন থেকেই। হয়তো তখন নামটি সুরবান ছিল না। তবে সুরপাগল মানুষ ছিলেন সংগীত সৃষ্টির প্রথম দিক থেকেই।”
শেকড়ের গানে ফিরতে চায়
বাংলার লোকগান, উচ্চাঙ্গসংগীত, যন্ত্রসংগীতসহ বিভিন্ন ধারার গান নিয়ে কাজ করতে চায় সংগঠনটি। যেসব গানের চর্চা একসময় ছিল জমজমাট, কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেকটাই কমে এসেছে—সেসব গানকে আবারও শ্রোতাদের কাছে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ থাকবে তাদের।
এ লক্ষ্যেই প্রতি মাসে আয়োজন করা হবে একটি করে বৈঠকি আসর। সেখানে বিভিন্ন শিল্পী এসে সুরপাগল শ্রোতাদের জন্য গান পরিবেশন করবেন। এর বিশেষ দিক হলো, শিল্পীরা কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই এসব আয়োজনে অংশ নেবেন।
বড় মঞ্চের জাঁকজমক নয়, সীমিতসংখ্যক শ্রোতা নিয়ে ঘরোয়া আবহে গান শোনার পরিবেশ তৈরি করাই হবে বৈঠকি আসরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নামমাত্র টিকিট ফি দিয়ে এসব আয়োজনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
প্রচারণাতেও পরিবেশবান্ধব ভাবনা
আয়োজনের প্রচারণায়ও ভিন্নতার কথা ভাবছে সুরবান। যেখানে-সেখানে পোস্টার লাগিয়ে পরিবেশ নষ্ট করতে চায় না তারা। ভবিষ্যতে কেবল অনলাইনের মাধ্যমে সীমিতসংখ্যক টিকিট বিক্রি করে বৈঠকি আসর আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে প্রথম আয়োজনের প্রচারের জন্য অল্প কিছু পোস্টার লাগানো হয়েছে। অনুষ্ঠান শেষে সেগুলো খুলে ফেলা হবে বলেও জানিয়েছে আয়োজকেরা।
‘প্রতিষ্ঠাতা সবাই, মুখপাত্রও সবাই’
সুরবানকে কোনো একক ব্যক্তির সংগঠন হিসেবে দেখতে চান না এর সঙ্গে যুক্তরা। দুর্জয় বড়ুয়া বলেন, “এই দলের প্রতিষ্ঠাতা এই দলের সবাই, এই দলের মুখপাত্রও এই দলের সবাই।”
তবে আয়োজনের ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে ছোট পরিসরে একটি কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
শুধু ব্যান্ড নয়, হারিয়ে যাওয়া গানেরও চর্চা
বর্তমান সময়ে ব্যান্ডসংগীতের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সংগীতের অন্যান্য ধারার প্রতিও নতুন প্রজন্মের আগ্রহ তৈরি হোক—এটাই তাদের প্রত্যাশা। ব্যান্ড গানের পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া ও কম চর্চিত গানগুলোর নিয়মিত চর্চা শুরু করতে চায় তারা।
এই ভাবনা নিয়ে কোনো একটি জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না সুরবান। অঞ্চল থেকে অঞ্চলে ঘুরে বৈঠকি আসর আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সুরপাগল মানুষদের একত্র করে গানের সেই পুরোনো আবহ ফিরিয়ে আনাই তাদের স্বপ্ন।
শুরু হচ্ছে ‘বাউল উঠোন ০১’
এই স্বপ্নের প্রথম আয়োজন ‘বাউল উঠোন ০১’। আজ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সুরবানের প্রথম বৈঠকি আসর। এতে শিল্পী হিসেবে থাকবেন ‘Dipra & Durjoy Brother’s’।
প্রথম আয়োজন ঘিরে সুরপাগল মানুষদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আগ্রহ। আয়োজকদের প্রত্যাশা, ছোট পরিসরের এই বৈঠকি আসরগুলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়বে বিভিন্ন অঞ্চলে। গানকে শুধু বিনোদন হিসেবে নয়, শেকড় ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে নতুন করে চেনানোর একটি পথ তৈরি হবে।
হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায়, কোনো নিরিবিলি উঠোনে বসবে এমনই আরেকটি বৈঠক। সামনে থাকবে কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র, চারপাশে কিছু সুরপাগল মানুষ—আর ভেসে আসবে বাংলার চেনা কোনো পুরোনো সুর। সেই সুরের টানেই এগিয়ে যেতে চায় ‘সুরবান’।