২৩ আগস্ট, ২০২৬

এতিম সুমাইয়ার বিয়ে হলো মহা ধুমধামে

এতিম সুমাইয়ার বিয়ে হলো মহা ধুমধামে

প্যান্ডেল ঘেরা বাড়ি। আলোক সজ্জা থেকে শুরু করে কোনো কিছুর কমতি নেই। ভেতরে মহা ধুমধামে চলছিল খাওয়া-দাওয়া। ভোজন শেষে পাত্রীকে আর্শীবাদ করছিলেন আগত লোকজন। সবমিলিয়ে বিয়ে বাড়িতে ব্যাপক উৎসব বিড়াজ করছিল।

বিয়ের এই আয়োজন ছিল এতিম সুমাইয়া (১৯) আক্তারের জন্য। গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় সুমাইয়া আক্তারকে পাত্রস্থ করা হয়। সুমাইয়া আক্তার রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামে মৃত সামছুল আলমের মেয়ে। ঘটা করে এতিম সুমাইয়ার বিয়ের আয়োজন করেছিলেন নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার রুহুল আমিন রুবেল।

সুমাইয়ার মা জহুরা বেওয়া উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে জানালেন-'হামার বিটিডাক ব্যা দেয়া শ্যাষ করলাম। একন সতিই মাথার ওপর তেনে একটা ভারী বুজাক নাইম্যা গ্যালো বাপু! বাপ-ছাঁড়া ই এতিম বিটিডাক যে এইরাম ঘটা ঘটাল করি বিয়া দিতে পারবো, স্যাডা জীবনেও ভাবি নাই। একজনা ভালো মানুষ আইস্যা এমন ধারার হাত বাড়ায় দিল বলেই ইজ্বতের সাথে বিটিডার বিয়াডাক পার করতে পারলাম।'

তিনি বলেন- মেয়ে যখন খুব ছোট, তখন স্বামী হারান তিনি। সেই থেকে কোলের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করেন। মাঠেঘাটে কাজ করে মেয়েকে বড় করেছেন। শিখিয়েছেন লেখাপড়া। কিন্তু বিয়ে দেওয়া নিয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল। সেই দুশ্চিন্তা দুর হলো রুহুল আমীনের সার্বিক সহায়তায়।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও রুহুল আমীন অসহায় এতিম নারীদের বিয়ে দিতে এগিয়ে এসেছেন। তার সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে দরিদ্র জহুরা বেওয়ার সামনে আসে। সেখান থেকে ঠিকানা সংগ্রহ করে রুহুল আমীনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দেখা করে মেয়ের বিয়ের কথা বলেন জহুরা বেওয়া। তাদের অসহায়ত্বের কথা শুনে পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেন রুহুল আমিন। শুক্রবার বিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সেই আশ্বাসের বাস্তবায়নও করেন

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, শুধু সুমাইয়া আক্তার নন। গত ২৪ বছরে তার মতো ১১২ জন এতিম নারীর বিয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন নাটোরের বড়াইগ্রামের রুহুল আমিন রুবেল।

রুহুল আমিন রুবেল বলেন, এর আগে তিনি আরো ১১১ টি পিতা হারা মেয়ের বিয়ে দিয়েন। এটি ১১২তম বিয়ে। বিয়ের সার্বিক ব্যয় তিনিই বহন করেছেন।বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে যে কেউ যোগাযোগ করলে তিনি সত্যতা যাচাই করে নিজের তহবিল থেকে বিয়ের যাবতীয় খরচ বহন করেন। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের দায়িত্ব ও সৌভাগ্য মনে করেন।

শুক্রবার বালাদিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই পুরো বাড়িতে উৎসবের আমেজ বিড়াজ করছিল। অতিথি ও বরযাত্রীদের আপ্যায়নের জন্য চলছিলগরু, খাসি, মুরগি, ডিম ও পোলাওসহ নানা পদের খাবার প্রস্তুতের কাজ। এতোসব রাজকীয় আয়োজন দেখে বোঝার উপায় নেই কোনো এতিম কন্যার বিয়ে বাড়ি এটি। এই বিয়ে গায়ে হলুদ থেকে শুরু করে সব আয়োজনই ছিল উৎসবমুখর।

জুমার নামাজের পর কনে বাড়িতে আসেন বর তরিকুল ইসলাম ও তার স্বজনেরা। রাজশাহীর তালাইমারী এলাকার বাসিন্দা বর তরিকুলকে সোনার আংটি দিয়ে বরণ করেন সেই রুহুল আমিন রুবেল। এরপর সম্পন্ন হয় বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা।

সুমাইয়ার মা জহুরা বেওয়া বলেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে তিনি বড় দুশ্চিন্তায় ছিলেন। পরে রুহুল আমীন বিয়ের সব দায়িত্ব নেন। নিজের মেয়ের মতো করে বিয়ের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছেন। এমন রাজকীয় আয়োজনে মেয়ের বিয়ে দিতে পারবেন তা তাদের কাছে ছিল কল্পনাতীত বিষয়।

নববধূ সুমাইয়া আক্তার তিথি ও বর তরিকুল ইসলামও রুহুল আমীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সুমাইয়া আক্তার বলেন, অভাব অনটন আর নানা প্রতিকুলতায় বড় হয়েছেন তিনি। এমন উৎসব মুখর আয়োজনে বিয়ে হবে তা তিনি ভাবেন নি। বাবা না থাকলেও বিয়ের দিন বাবার অভাব পূরণ করেছেন রুহুল আমীন।

বর তরিকুল ইসলামও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, কনে বাড়ির আতিথিয়তা ও বিয়ের আয়োজন তাকে মুগ্ধ করেছে। নবদম্পতি তাদের নতুন জীবনের জন্য সবার কাছে দোয়া চান।

স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও এলাকাবাসীও রুহুল আমীনের মহানুভবতার প্রশংসা করেন। তাদের মতে, অসহায় ও এতিম মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে বিয়ের মতো কঠিন দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন রহুল আমীন। এতো বছর ধরে নিজের অর্থে বিয়ের দায়িত্ব পালন করা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ ও মানবিক কাজ। সমাজের বিত্তবানরা এমন কাজে এগিয়ে এলে আরও অনেক অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফুটবে।