১৯ আগস্ট, ২০২৬

ইউএনও কার্যালয়ে ভাঙচুর: উপজেলা প্রশাসনের দুই এজাহারে সরকারদলীয় ২৫ নেতাকর্মী অভিযুক্ত

ইউএনও কার্যালয়ে ভাঙচুর: উপজেলা প্রশাসনের দুই এজাহারে সরকারদলীয় ২৫ নেতাকর্মী অভিযুক্ত

ফ্যামিলি কার্ডের শুমারির ফল ঘোষণা নিয়ে ইউএনওকে লাঞ্ছিত ও কার্যালয়ে হামলা-ভাংচুরের ঘটনায় দুটি পৃথক এজাহার দায়ের করেছে উপজেলা প্রশাসন। সরকারদলীয় ২৫ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে সোমবার (১৭ আগস্ট) এজাহার দুটি দায়ের করা হয়। এতে আরো অন্তত ২০০ জন অজ্ঞাত রয়েছে।

লালপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাহী কর্মকর্তার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আবু মাসুদ রানা এবং বাগাতিপাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাহী কর্মকর্তার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. শুকুর আলী সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত এজাহার দায়ের করেন।

এজাহারে লালপুরের ঘটনায় ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৫০ এবং বাগাতিপাড়ার ঘটনায় ৭ জনের নাম উল্লখ করে অজ্ঞাত ১৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

ইউএনওসহ সরকারি কয়েকজন কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত এবং সরকারি সম্পদ ভাংচুর করার ঘটনায় পৃথক দুটি এজাহার দায়ের হলেও ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ। অথচ ঘটনার ভিডিও এবং ছবিতে অপরাধীদের স্পষ্ট হামালা করতে দেখা যাচ্ছে।

লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আবু মাসুদ রানা তার এজাহারে উল্লেখ করেন- ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফল বাতিলের দাবিতে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা গত ১২ আগস্ট দুপুরে  লালপুর উপজেলা পরিষদের সামনে জড়ো হয়ে নামা ধরণের স্লোগান দেন। এ সময় সরকারি অন্যান্য কর্মকর্তাদের নিয়ে নিজের দপ্তরে অবস্থান করছিলেন ইউএনও।

একপর্যায়ে ৪০ থেকে ৫০ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রবেশ করে বিক্ষোভ ও স্লোগান দিয়ে উপস্থিত কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করেন। নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল বাতিলের জন্য বেআইনিভবে চাপ দিতে থাকেন। মারধর করা হয় উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে। মাটিতে ফেলে ওই কর্মকর্তার শার্ট ছিড়ে ফেলা হয়। শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তাকেও। ভাংচুর করা হয় চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র। চাপ দেওয়া হয় ইউএনওর কক্ষে থাকা সিসি ক্যামেরা বন্ধ করতে।একপর্যায়ে অভিযুক্তরা সিসি ক্যামেরার তার ছিড়ে ফেলেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিক্ষুব্ধদের কয়েকজন ইউএনওকে ঘিরে ধরার পর অশালীন ভাষায় গালমন্দ করতে করতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। ইউএনও'র গায়ে ডিম ছুড়ে মারেন ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীরা। পরে কর্মকর্তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে উপজেলা পরিষদ চত্বরে গিয়ে আবারও বিক্ষোভ করেন অভিযুক্তরা।

এদিকে বাগাতিপাড়া উপজেলাতেও ওই দিন একই ধরণের ঘটনা ঘটে।

বাগাতিপাড়ার প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়ের করা এজাহারে বলা হয়েছে, গত ১২ আগস্ট সকালে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগ পরীক্ষার ফল বাতির দাবি  করে বিক্ষোভ করেন সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা। বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে আপত্তিকর স্লোগান দিতে থাকেন। ইউএনওকে লাঞ্ছিত করার জন্য কক্ষের দরজ খুলতে চাপ দেন। একপর্যায়ে কার্যালয়ের বারান্দায় থাকা কয়েকটি ফুলের টব ও একটি স্টিলের ফটক ভাঙচুর করা হয়। প্লাস্টিকের চেয়ার দিয়ে ইউএনও কার্যালয়ের সহকারি প্রশাসনিক কর্মকর্তার কপালে আঘাত করা হয়।

অভিযোগে আরও উল্লেখ জরস হয়েছে, ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করছিলেন উপজেলা ভূমি অফিসের একজন কর্মচারী। বিক্ষুব্ধরা ওই কর্মচারীকে মারধর করে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেন । পরে টেবিলে আঘাত করে ইউএনওকে আপত্তিকর ভাষায় কথা গালিগালাজ করা হয়।

উপজেলা প্রশাসন বলছে- ফ্যামিলি কার্ডের প্রকাশিত ফলাফল নিয়ে লিখিতভাবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিতে বলে উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু বিক্ষুব্ধরা অভিযোগ না দিয়ে দলীয় দাপট দেখিয়ে পুরো ফল বাতিলের জন্য ইউএনওকে ইউএনওকে লাঞ্ছিত করেন।

এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পৃথক দুটি এজাহার দায়ের করে উপজেলা প্রশাসন। এই ঘটনার ছবি এবং ভিডিও ধারণের সময় হামলাকারীরা সাংবাদিকদের মারধর করে মোবাইল ও ক্যামেরা ছিনিয়ে নেন।

এজাহার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে লালপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, লালপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়ের করা এজাহার তিনি পেয়েছেন। পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে পুলিশ

বাগাতিপাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ইউএনও কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় একটি লিখিত এজাহার পেয়েন তিনিও। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত মেতাবেক ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন তিনি।

এদিকে ঘটনার পর পরই দুই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি, নাটোরের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।