ফ্যামিলি কার্ডের শুমারির ফল ঘোষণা নিয়ে ইউএনওকে লাঞ্ছিতের পর ডিম নিক্ষেপ ও কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে মারধরের পর কার্যালয়ে ভাংচুরের ঘটনায় এজাহার দায়ের করেছে লালপুর উপজেলা প্রশাসন। তবে এজাহারটি মামলা হিসেবে রুজু করেনি পুলিশ।
উপরন্তু সোমবার ওই এজাহার দায়েরের পর গতকাল মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার, নাটোরের জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার ও লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে।
তবে কি কারণে তাদের বদলি করা হয়েছে, আদেশে তা স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। এই বদলির সঙ্গে লালপুর উপজেলা প্রশাসনের এজাহার দায়েরের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
লালপুরের ইউএনও বরকত উল্লাহকে প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে ইউএনও হিসেবে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বদলি করা হয়। তবে বিভাগীয় কমিশনার ড. এএনএম বজলুর রশীদের ও নাটোর জেলা প্রশাসক আসমা শহীনের প্রত্যাহার আদেশে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। স্ব স্ব পদ থেকে তাদের প্রত্যহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে।
এজাহার দায়েরের পরদিনই বদলির বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার ড. এএনএম বজলুর রশীদ, জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন ও লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরকত উল্লাহর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশ মামলা রুজু করছে না
প্রকাশ্যে ১২ আগস্ট দুপুরে নাটোরের লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা। বাগাতিপাড়া উপজেলাতেও নির্বাহী কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করে ভাংচুর চালানো হয়। দুই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এজাহার দায়ের করা হয় ১৭ আগস্ট। অথচ ঘটনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্য প্রমাণ থাকলেও অদৃশ্য কারণে এজাহার দুটি এখনো মামলা হিসেবে রুজু করেনি পুলিশ।
এজাহার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে দুই থানার ওসি বলছেন- উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি না জানার কথা বলেছেন রাজশাহীর উপ মহা পুলিশ পরিদর্শকও।
সেদিন যা ঘটেছিল
লালপুর ও বাগাতিপাড়া প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুলের নির্বাচনী এলাকা। এই দুই উপজেলাতেই দুই ইউএনওকে অবরুদ্ধ করে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন- বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের জন্য সুপারভাইজার ও কর্মী নিয়োগ পরীক্ষার ফল ঘোষণা করা হয়। শুমারির জন্য আওয়ামী লীগের লোকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ তোলেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে প্রতিবাদ জানিয়ে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করেন।
বাগাতিপাড়া উপজেলার মালঞ্চি রেলগেট এলাকা থেকে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল রানার নেতৃত্বে মিছিলটি ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। সেখানে গিয়ে ইউএনওর বিরুদ্ধে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন স্লোগান দেন। একপর্যায়ে সেখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে বিক্ষোভকারীরা ইউএনওর কক্ষের সামনে ভাংচুর করেন। ইউএনও ও কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে শারিরীকভবে লাঞ্ছিত করেন। এ সময় সাংবাদিকদেরও মারধর করে মোবাইল ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে সব তথ্য মুছে দেন। তবে ঘটনাস্থলে পুলিশ থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশ নিরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
ইউএনওকে মারধর, থানায় এজাহার
এদিকে সরকারদলীয় ১৮ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত ৫০জনকে অভিযুক্ত করে সোমবার (১৭ আগস্ট) থানায় এজাহার দায়ের করা হয়।
লালপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাহী কর্মকর্তার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আবু মাসুদ রানা এজাহারটি দায়ের করেন। এজাহারে ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৫০ অভিযুক্ত করা হয়েছে।
ইউএনওসহ সরকারি কয়েকজন কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত এবং সরকারি সম্পদ ভাংচুর করার ঘটনায় পৃথক দুটি এজাহার দায়ের হলেও পুলিশ মামলা রুজু না করায় অভিযোগকারীরাও চরম আতংকে রয়েছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা প্রকাশ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।
লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আবু মাসুদ রানা তার এজাহারে উল্লেখ করেন- ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফল বাতিলের দাবিতে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা গত ১২ আগস্ট দুপুরে লালপুর উপজেলা পরিষদের সামনে জড়ো হয়ে নানা ধরণের স্লোগান দেন। এ সময় সরকারি অন্যান্য কর্মকর্তাদের নিয়ে নিজের দপ্তরে অবস্থান করছিলেন ইউএনও।
একপর্যায়ে ৪০ থেকে ৫০ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রবেশ করে বিক্ষোভ ও স্লোগান দিয়ে উপস্থিত কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করেন। নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল বাতিলের জন্য বেআইনিভবে চাপ দিতে থাকেন। মারধর করা হয় উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে। মাটিতে ফেলে ওই কর্মকর্তার শার্ট ছিড়ে ফেলা হয়। শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তাকেও। ভাংচুর করা হয় চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র। চাপ দেওয়া হয় ইউএনওর কক্ষে থাকা সিসি ক্যামেরা বন্ধ করতে।একপর্যায়ে অভিযুক্তরা সিসি ক্যামেরার তার ছিড়ে ফেলেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিক্ষুব্ধদের কয়েকজন ইউএনওকে ঘিরে ধরার পর অশালীন ভাষায় গালমন্দ করতে করতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। ইউএনও'র গায়ে ডিম ছুড়ে মারেন ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীরা। পরে কর্মকর্তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে উপজেলা পরিষদ চত্বরে গিয়ে আবারও বিক্ষোভ করেন অভিযুক্তরা।
এদিকে বাগাতিপাড়া উপজেলাতেও ওই দিন একই ধরণের ঘটনা ঘটে। বাগাতিপাড়ার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো.শুকর আলীর দায়ের করা এজাহারে বলা হয়েছে, গত ১২ আগস্ট সকালে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগ পরীক্ষার ফল বাতল দাবি করে বিক্ষোভ করেন সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা। বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে আপত্তিকর স্লোগান দিতে থাকেন। ইউএনওকে লাঞ্ছিত করার জন্য কক্ষের দরজা খুলতে চাপ দেন। একপর্যায়ে কার্যালয়ের বারান্দায় থাকা কয়েকটি ফুলের টব ও একটি স্টিলের ফটক ভাঙচুর করা হয়। প্লাস্টিকের চেয়ার দিয়ে ইউএনও কার্যালয়ের সহকারি প্রশাসনিক কর্মকর্তার কপালে আঘাত করা হয়।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করছিলেন উপজেলা ভূমি অফিসের একজন কর্মচারী। বিক্ষুব্ধরা ওই কর্মচারীকে মারধর করে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেন । পরে টেবিলে আঘাত করে ইউএনওকে আপত্তিকর ভাষায় কথা গালিগালাজ করা হয়।
উপজেলা প্রশাসন বলছে- ফ্যামিলি কার্ডের প্রকাশিত ফলাফল নিয়ে লিখিতভাবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিতে বলে উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু বিক্ষুব্ধরা অভিযোগ না দিয়ে দলীয় দাপট দেখিয়ে পুরো ফল বাতিলের জন্য ইউএনওকে ইউএনওকে লাঞ্ছিত করেন।
এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পৃথক দুটি এজাহার দায়ের করে উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এজাহার দুটি মামলা হিসেবে রুজু করেনি পুলিশ।
এজাহার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে লালপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, লালপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়ের করা এজাহার তিনি পেয়েছেন। পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে পুলিশ
বাগাতিপাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ইউএনও কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় একটি লিখিত এজাহার পেয়েছেন তিনি। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত মেতাবেক ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন তিনি।
ঘটনার পর পরই দুই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি, নাটোরের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে চিঠি দেওয়া হয়।
এদিকে নাটোর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, তথ্য-প্রমান অনুযায়ী প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। কিন্তু বিএনপির উপজেলা, পৌর এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের দলীয় পদ উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দলকে হেয় করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে নেতাকর্মীদের মামলায় জড়ানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট বা সরকারি কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় যারা প্রকৃতভাবে জড়িত, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে বিএনপি। তবে কোনো নিরাপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি বা দলীয় নেতাকর্মীদের ঢালাওভাবে মামলায় জড়ানোর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তিনি।
এজাহার দায়ের ও একদিনে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ তিন কর্মকর্তা বদলির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাটোর জেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুস সামাদ শিশির। সেখানে তিনি লিখেন- 'লালপুর-বাগাতিপাড়ায় ইউএনও অফিস ভাঙচুরের অভিযোগে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার পরেই নাটোর জেলার ডিসি ও ইউএনও প্রত্যাহার। যে দেশে পুরস্কারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও ক্ষমতার কাছে মাথা নত না করার জন্য প্রত্যাহারের শিকার হন, সে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা শঙ্কিত।'
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নাটোর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বুলবুল আহমেদ বলেন, সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার কারণে ইউএনও ও ডিসিকে বদলি করা হয়েছে। অথচ কর্মকর্তাদের দায়ের করা অভিযোগ মামলায় রূপ নেয়নি। এমনটি হয়ে থাকলে তা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় চরম ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারের অঙ্গীকার ও প্রচেষ্টার সঙ্গে সাংঘর্ষিকও। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ধরনের ঘটনা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দুর্নীতি ও অনিয়মকে উৎসাহিত করবে।
রাজশাহীর উপ মহা পুলিশ পরিদর্শক আশিক সাঈদ বলেন, নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলায় হামলার ঘটনায় পুলিশের কাছে এজাহার দেওয়ার বিষয়ে তিনি অফিশিয়ালভাবে কিছু জানেন না। এ জন্য তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারছেন না।
সমাজ কল্যান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল ফোন না ধরায় এসব ব্যপারে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।