রসিদ ছাড়া অর্থ আদায়ের অন্যায্য ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ট্রেন টিকিট এক্সামিনারের (টিটিই) হাতে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নির্মম শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ফোরকান উদ্দীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। এই ঘটনার জেরে আজ মঙ্গলবার ভোর থেকেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। সুবিচারের দাবিতে ক্যাম্পাসের চারুকলা সংলগ্ন রেললাইনে অবস্থান নিয়ে তারা সর্বাত্মক অবরোধ শুরু করেন।
শিক্ষার্থীদের আকস্মিক এই আন্দোলনের মুখে রাজশাহীর সঙ্গে ঢাকাসহ সারা দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। এতে করে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো সাধারণ যাত্রী।
অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় আক্রমণ!
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ফোরকান জানান, সোমবার রাতে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ‘পদ্মা এক্সপ্রেস’ ট্রেনে রাজশাহী ফিরছিলেন তিনি। যাত্রাপথে কয়েকজন টিটিই টিকিট না থাকা যাত্রীদের কাছ থেকে কোনো প্রকার রসিদ ছাড়াই নগদ অর্থ পকেটস্থ করছিলেন। চোখের সামনে এই অনিয়ম দেখে তিনি এর প্রতিবাদ জানালে টিটিই তাঁর ওপর চড়াও হন।
"সামনের যাত্রীদের কাছ থেকে কোনো রসিদ না দিয়ে টাকা নিচ্ছিলেন টিটিই। আমি এর প্রতিবাদ করতেই পেছন থেকে এক টিটিই আমার ওপর হামলা করেন। আমাকে টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেওয়া হয়, এমনকি গলা চেপে ধরে পায়ে আঘাত করা হয়।"
— ফোরকান উদ্দীন, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী
চার দফা দাবিতে অটল শিক্ষার্থীরা
টিটিই-র এমন অপেশাদার ও সন্ত্রাসী আচরণের খবর ছড়িয়ে পড়লে মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার সঙ্গেই চারুকলা সংলগ্ন রেলপথে অবস্থান নেন রাবি শিক্ষার্থীরা। অন্যায়ের জট খুলতে তারা তুলে ধরেছেন স্পষ্ট ৪ দফা দাবি:
অভিযুক্ত টিটিই-র উপস্থিতি: লাঞ্ছনায় জড়িত টিটিই-কে অবিলম্বে শিক্ষার্থীদের সামনে সশরীরে উপস্থিত করতে হবে।
স্থায়ী বহিষ্কার: ঘুষ গ্রহণ ও অনিয়মের প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধে অভিযুক্তের স্থায়ী চাকরিচ্যুতি নিশ্চিত করা।
আইনগত শাস্তি: ট্রেনের ভেতর যাত্রীকে হত্যাচেষ্টার অপরাধে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
রাবি স্টেশনে বিরতি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে সব দূরপাল্লার ট্রেনের বিরতি বা 'স্টপেজ' কার্যকর করা।
থমকে গেছে চাকা, চরম ভোগান্তিতে যাত্রীরা
অবরোধের কারণে সকাল থেকেই দূরপাল্লার কোনো ট্রেন রাজশাহী ছেড়ে যেতে পারেনি, আসতেও পারছে না স্টেশনে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সকাল সাড়ে ১০টা অতিক্রম করলেও নির্ধারিত সময়ের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ও ‘সিল্কসিটি এক্সপ্রেস’ রাজশাহী স্টেশনেই আটকা পড়ে আছে।
শিক্ষার্থী নেতা ও শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছেন, "রেলে যাত্রী হয়রানি ও ঘুষবাণিজ্য নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযুক্তের উপযুক্ত শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত আমরা পথ ছাড়ব না।"
সমাধানের খোঁজে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎপর রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান জানিয়েছেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আলোচনার জন্য সায় দিয়েছে। তবে আলোচনার স্থান—ক্যাম্পাস নাকি রেলস্টেশন—তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে। শিক্ষার্থীরা যেন তাদের সঠিক বিচার পায় এবং দ্রুত রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়, সে লক্ষ্যেই কাজ করছে প্রশাসন।