বর্ষার মেঘলা আকাশ মাথায় নিয়ে আষাঢ়ের এক সকালে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানায় পা রাখতেই বদলে যায় চেনা জগৎ। কুড়িয়ানা বাজারের দক্ষিণে ডালপালা ছড়িয়ে জলপথের পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল পুরোনো শিরীষগাছ। তার ছায়ায় জমে উঠেছে কোষা নৌকার হাট। সেখান থেকে শুরু হওয়া জালের মতো বিছানো সরু খালগুলো যেন এই জনপদের শিরা-উপশিরা।
সেই রুপালি জলপথ ধরে কোষা নৌকায় ভাসতে ভাসতে দু-পাশে চোখে পড়ে পেয়ারা, আমড়া আর লেবুর বাগান। কোথাও গাছের ডাল নুয়ে পড়েছে পানির ওপর, কোথাও পরিখা বেয়ে বাগানের ভেতর চলে যাচ্ছে কৃষকের নৌকা, আবার কোথাও শিশুরা মেতেছে জলকেলিতে। প্রায় ৪০ মিনিটের এই নৌ-ভ্রমণ শেষে যখন ভীমরুলী খালের মোহনায় পৌঁছানো যায়, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক জাদুকরী দৃশ্য—বিখ্যাত ভাসমান হাট।
শতাব্দি প্রাচীন জল-বাজার
খালের বুকজুড়ে তখন শত শত নৌকার মেলা। কোনো নৌকায় স্তূপ করে রাখা কাঁচা-পাকা পেয়ারা, কোনোটিতে কাগজি লেবু, আবার কোনোটিতে সবুজ ডাব। নৌকার গায়ে নৌকা লাগিয়ে পানির ওপরই গড়ে উঠেছে এক অনন্য বাজার। কোনো চিল চিৎকার নেই, শান্ত অথচ কর্মব্যস্ত এক ছন্দে চলছে বিকিকিনি। ট্রলারে উঠছে ফলের চালান, দাঁড়িপাল্লায় মাপা হচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী ভাসমান হাট ও ফল চাষের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে বানারীপাড়া, ঝালকাঠি সদর ও নেছারাবাদের অন্তত ৫০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা। প্রায় ১,৯৩২ হেক্টর জমিতে বিস্তৃত এই দেশি পেয়ারার স্বর্গরাজ্য।
ঐতিহ্যের অন্তরালে বদলে যাওয়া ভূগোল
সৌন্দর্যের এই ক্যানভাসের পেছনে লুকিয়ে আছে চাষিদের এক বুক দীর্ঘশ্বাস। প্রকৃতির বৈরিতা আর আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে বিপন্ন হতে চলেছে শত বছরের এই ঐতিহ্য।
"কয়েক বছর ধরেই পেয়ারার ফলন খুব খারাপ। অতিরিক্ত গরমে ফুল, মুকুল, কচি পেয়ারা সব ঝরে গেছে। দামও এখন মণে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এখন আর চাষ করে টিকে থাকা দায়।"
— শংকর ঢালী (৪০), স্থানীয় পেয়ারা চাষি
আরেক চাষি জাহিদ মিয়ার কণ্ঠেও একই সুর। পেয়ারায় লোকসান হওয়ায় তিনি এখন পেয়ারার জমিতে লেবু, আমড়া ও মাল্টার চাষ শুরু করেছেন। ফলে শুধু অর্থনীতিই নয়, বদলে যাচ্ছে এই অঞ্চলের চিরচেনা পেয়ারা-ভূগোলও।
সংকটের তিন দেয়াল:
সংরক্ষণাগারের অভাব: ফল পচনশীল হওয়ায় দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন চাষিরা, ফলে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অনুপস্থিতি: এখানে কোনো জুস বা জ্যাম তৈরির কারখানা গড়ে না ওঠায় উদ্বৃত্ত ফল কাজে লাগানো যায় না।
ঋণের ফাঁদ: সহজ শর্তে সরকারি ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় চাষিরা চড়া সুদে এনজিও থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন, যার কারণে লাভের গুড় খেয়ে ফেলে সুদের কিস্তি।
জলপথ যেখানে জীবন
এই অঞ্চলে নৌকা কেবল যাতায়াতের বাহন নয়, এটি এখানকার মানুষের অস্তিত্বের অংশ। বাজার করা, বাগানের পরিচর্যা করা, ফল পরিবহন থেকে শুরু করে শিশুদের স্কুলে পাঠানো—সবকিছুই চলে কোষা নৌকায় চড়ে। খালের দুই পাশে চাষের সুবিধার জন্য তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম পরিখা, যা এক অনন্য জলজ বাস্তুতন্ত্রের সৃষ্টি করেছে।
রূপালী ভেনিস ও পর্যটনের হাতছানি
খাল, বাগান আর ভাসমান হাটের এই নৈসর্গিক রূপের কারণে অনেকেই একে বলেন ‘বাংলার ভেনিস’। বর্ষায় এখানকার সৌন্দর্য যেন শতগুণ বেড়ে যায়। পর্যটকদের সুবিধার্থে ভীমরুলীতে গড়ে উঠেছে ভাসমান হোটেল, ট্রলার ও ট্যুরিস্ট বোট। কাছেই রয়েছে কাঠুরাকাঠির ন্যাচারাল ট্যুরিজম পার্ক এবং আদমকাঠির রিয়ান পেয়ারা পার্কের মতো দর্শনীয় স্থান।
ঘুরতে আসা পর্যটক তালিমুল ইসলামের মতে:
"ছবি বা ভিডিওতে যা দেখেছি, বাস্তবে এই অঞ্চল তার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর। এ এক অতুলনীয় অনুভূতি।"
প্রকৃতির এই অপরূপ সৃষ্টি আর মানুষের জীবনসংগ্রামের মায়াবী মেলবন্ধন কুড়িয়ানা-ভীমরুলী। তবে এই ঐতিহ্যকে চিরজীবী করতে হলে এখনই প্রয়োজন পেয়ারা সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সরকারি উদ্যোগ এবং চাষিদের জন্য সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা।