পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের দূরপাল্লার আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (আইসিবিএম) বিরল পরীক্ষা ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বেইজিংয়ের এই পদক্ষেপকে ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও সম্প্রসারণবাদী অবস্থানের প্রদর্শন হিসেবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলো। পরীক্ষাটির পর পরই যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের তীব্র তোপের মুখে পড়েছে চীন।
ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বিবরণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
চীনা সূত্র ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গত সোমবার দুপুর ১২টা ১ মিনিটে চীনের উপকূলীয় জলসীমা থেকে পারমাণবিক সাবমেরিনের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়।
পাল্লা ও গতিপথ: ক্ষেপণাস্ত্রটি কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের নির্ধারিত এলাকায় গিয়ে পড়ে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে, এটি চীনের উপকূল থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম।
জেএল-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের সংশয়: চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ক্ষেপণাস্ত্রের সুনির্দিষ্ট মডেল প্রকাশ না করলেও সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি তাদের সবচেয়ে আধুনিক সাবমেরিন-উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র 'জেএল-৩ (JL-3)'। এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১০,০০০ কিলোমিটারের বেশি। তবে এটি যদি পুরোনো জেএল-২ (JL-2) মডেলও হয়ে থাকে, তবে এটি তার সর্বোচ্চ সীমা অর্থাৎ প্রায় ৭,৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। অবশ্য বেইজিং জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটিতে কোনো বিধ্বংসী গোলা (ওয়ারহেড) ছিল না।
কেন এই পরীক্ষা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে?
চীনের এই পদক্ষেপ এমন এক অঞ্চলে চালানো হয়েছে যা আন্তর্জাতিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৮৬ সালের 'রারোটোঙ্গা চুক্তি' অনুযায়ী দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল, যেখানে ১৯৮৭ সালে চীন নিজেই স্বাক্ষর করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা এই অঞ্চলে কোনো পারমাণবিক পরীক্ষা চালাবে না। নিউজিল্যান্ডের দাবি, চীন এই পরীক্ষা চালানোর মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
তীব্র প্রতিক্রিয়া ও তোপ: কে কী বললেন?
চীনের এই আকস্মিক শক্তির প্রদর্শনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রতিবেশী ও পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো:
যুক্তরাষ্ট্র: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জোর দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানোর চেষ্টা করছে, তখন চীন ঠিক উল্টোপথে হাঁটছে।” তিনি চীনকে নিয়মিতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার আগে তথ্য বিনিময়ের আহ্বান জানান।
অস্ট্রেলিয়া: দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ একে 'উসকানিমূলক পদক্ষেপ' আখ্যা দিয়ে বলেন, “আমাদের পারমাণবিক অস্ত্র বাড়ানো নয়, কমানো দরকার। অত্যন্ত অল্প সময়ের নোটিশে এমন পরীক্ষা চালানো সত্যিই উদ্বেগজনক।” পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং চীনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সলোমন দ্বীপপুঞ্জ: চীনের মিত্র হিসেবে পরিচিত দেশটির প্রধানমন্ত্রী ম্যাথিউ ওয়ালে ক্ষোভ প্রকাশ করে সরাসরি বলেন, “এটা বন্ধুসুলভ কাজ নয়। আমাদের বন্ধু হোন, কিন্তু আমাদের ভয় দেখাবেন না।”
তাইওয়ান: তাইরপে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলা হয়েছে, এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভয় দেখানোর জন্য চীনের একটি নোংরা চেষ্টা মাত্র।
বেইজিংয়ের আত্মপক্ষ সমর্থন
বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং জানান, এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা কোনো নির্দিষ্ট দেশকে নিশানা করে করা হয়নি, বরং এটি তাদের বার্ষিক নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ। ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ ও পেশাদারত্ব বজায় রেখে পরিচালিত হয়েছে দাবি করে তিনি মিত্র দেশগুলোকে বিষয়টি নিয়ে 'অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা' না করার অনুরোধ জানান।
নেপথ্যের কৌশলগত বার্তা: বিশেষজ্ঞদের মত
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার টাইমিং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রতিরক্ষা চুক্তির জবাব: চীন যখন এই পরীক্ষা চালায়, ঠিক তখনই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অস্ট্রেলিয়া ও ফিজি একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করছিল। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) গবেষক মেইয়া নাউয়েন্স মনে করেন, এই প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতি অসন্তোষের বার্তা দিতেই চীন এই সময়টি বেছে নিয়ে থাকতে পারে।
ভাবমূর্তি সংকটের ঝুঁকি: বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, শক্তির এই প্রদর্শন হিতে বিপরীত হতে পারে এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর কাছে চীনের নির্ভরযোগ্য বন্ধুর ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করতে পারে।