১৭ জুলাই, ২০২৬

জিয়া হত্যার আসামি মেজর মোজাফফর ৪৫ বছর কোথায় লুকিয়ে ছিলন

জিয়া হত্যার আসামি মেজর মোজাফফর ৪৫ বছর কোথায় লুকিয়ে ছিলন

সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে যে রহস্যের জট খোলেনি, অবশেষে সেই ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটতে চলেছে। দীর্ঘ ৪৫ বছর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে কানামাছি খেলার পর, অবশেষে আইনের জালে ধরা পড়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী ও অন্যতম প্রধান পলাতক আসামি সাবেক মেজর মোজাফফর হোসেন।

গত বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে রাজধানীর বনানীর একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দীর্ঘ জেরার পর পরিচয় নিশ্চিত হয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের (এমপি) একটি বিশেষ দলের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে ৭৭ বছর বয়সী এই সাবেক সেনা কর্মকর্তার গ্রেপ্তার দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে এক বিশাল ভূকম্পন সৃষ্টি করেছে।

সার্কিট হাউসের সেই রক্তাক্ত ভোর: সেদিন কী ঘটেছিল?
১৯৮১ সালের ৩০ মে। চট্টগ্রামের আকাশ তখনো ভোরের আলোয় পুরোপুরি খোলেনি। ঠিক সেই মুহূর্তে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হানা দেয় একদল বিক্ষুব্ধ ও সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তা। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের কালজয়ী গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’-এর ত্রয়োদশ অধ্যায়ে এই হত্যাকাণ্ডের যে রোমহর্ষক বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তার অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন এই মোজাফফর।

রাষ্ট্রপতির মুখোমুখি মোজাফফর: গোলাগুলির শব্দ শুনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন তার সবচেয়ে কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন তৎকালীন মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মেজর মোজাফফর তখন প্রচণ্ড ভয়ে কাঁপছিলেন।

ভুল বার্তা ও আকস্মিক ব্রাশফায়ার: মোসলেহউদ্দিন রাষ্ট্রপতিকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, "ভয় পাওয়ার কিছু নেই, স্যার।" কারণ মোজাফফর ও মোসলেহউদ্দিন ভাবছিলেন জিয়াকে হত্যা করা হবে না, কেবল সার্কিট হাউস থেকে বন্দি করে সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু তাদের সেই ধারণাকে চূর্ণ করে দিয়ে আকস্মিকভাবে সামনে এগিয়ে আসেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান এবং তার সাবমেশিনগানের নির্মম ব্রাশফায়ারে ঝাঁঝরা করে দেন রাষ্ট্রপ্রধানকে।

হত্যাকাণ্ডের পরও সক্রিয় ছিলেন মোজাফফর
মাসকারেনহাসের বিবরণ প্রমাণ করে যে, মোজাফফরের ভূমিকা কেবল হত্যাকাণ্ডের মুহূর্তে নীরব দর্শকের মতো উপস্থিত থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হত্যার মিশন সফল হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর তিনি আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন:

জিয়ার ডায়েরি ও নথিপত্র গায়েব: হত্যাকাণ্ডের এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা সশস্ত্র সৈন্যদের নিয়ে পুনরায় সার্কিট হাউসে প্রবেশ করেন। তারা জিয়ার শোবার ঘরে তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালান। জিয়ার অত্যন্ত ব্যক্তিগত ডায়েরি ও বেশ কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল 'গোপন নথিপত্র' তারা সেখান থেকে নিজেদের হেফাজতে নেন।

লাশ সরিয়ে ফেলা: তল্লাশি শেষে জিয়ার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র একটি পুরোনো স্যুটকেসে ভরা হয় এবং জিয়া ও তার নিহত দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তার মরদেহ কাপড়ে মুড়িয়ে সামরিক গাড়িতে করে সরিয়ে ফেলা হয়।

বিপ্লবী পরিষদের বৈঠক: পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত সেই কুখ্যাত বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন, যেখানে মঞ্জুর ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

শ্বাসরুদ্ধকর পলায়ন পর্ব: মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফেরা
১ জুন ভোরে যখন বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়া নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন জেনারেল মঞ্জুরসহ মূল ষড়যন্ত্রকারীরা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। মাসকারেনহাসের তথ্য অনুযায়ী, পালানোর সময় প্রথম জিপটিতে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব, মেজর মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মুনীর।

পথিমধ্যে রাঙ্গুনিয়ার কাছে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তাদের তুমুল গোলাগুলি শুরু হয়। এই মুখোমুখি সংঘর্ষে গোলার আঘাতে মতিউর রহমান ও মাহবুব ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং মুনীর গ্রেপ্তার হন। কিন্তু অসীম চাতুর্যের সাথে সেই গোলাগুলির মধ্য থেকে জীবন বাঁচিয়ে গভীর জঙ্গলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন মোজাফফর। এরপর থেকেই মূলত তার দীর্ঘ ৪৫ বছরের পলাতক জীবনের শুরু।

ভারত থেকে ব্যাংকক: দীর্ঘ নির্বাসনের অজানা অধ্যায়
মোজাফফরের এই দীর্ঘ পলাতক জীবনের একটি রোমাঞ্চকর তথ্য পাওয়া যায় সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ে।

বইটির বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত মইনুল হোসেন চৌধুরী যখন থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন জিয়া হত্যাকাণ্ডের আরেক পলাতক আসামি মেজর এস এম খালেদ ব্যাংককে অবস্থান করছিলেন। অন্যদিকে, মোজাফফর তখন ভারতে ছদ্মনামে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন।

একদিন মোজাফফর ভারত থেকে গোপনে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ব্যাংককে যান এবং খালেদকে সাথে নিয়ে রাষ্ট্রদূত মইনুল হোসেন চৌধুরীর সাথে দেখা করেন। সেখানে তারা দাবি করেছিলেন:

তারা জিয়াকে হত্যা করতে চাননি; তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ ও শাহ আজিজুর রহমানসহ কয়েকজন মন্ত্রীকে অপসারণ করতে জিয়াকে চাপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে কেবল বন্দি করতে চেয়েছিলেন।

কর্নেল মতিউর রহমান হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে জিয়াকে গুলি করে বসায় পুরো পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে যায়।

দীর্ঘ নীরবতা ও অলক্ষ্যে ফেরা: নেপথ্যে কারা ছিল?
ব্যাংকক বৈঠকের পর কেটে গেছে বহু বছর। ১৯৯৩ সালে খালেদ ব্যাংককেই মারা যান। ফলে মোজাফফরই হয়ে ওঠেন এই ঘটনার একমাত্র জীবিত প্রত্যক্ষদর্শী।

ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মোজাফফর দীর্ঘকাল ধরে ছদ্মনাম ব্যবহার করে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যাতায়াত করতেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে:

কারা দিল আশ্রয়? বনানীর মতো একটি অভিজাত ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় তিনি কীভাবে বছরের পর বছর নিজের পরিচয় গোপন করে বাস করছিলেন?

কার অর্থায়নে চলতেন? দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে একটি স্বাধীন দেশে আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বেঁচে থাকার পেছনে তাকে কারা নিয়মিত অর্থায়ন ও রাজনৈতিক বা সামাজিক ছত্রছায়া দিয়ে আসছিল?

অবসান ঘটবে কি অমীমাংসিত ইতিহাসের?
জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন সামরিক আদালতে তড়িঘড়ি করে ১৮ জন সেনা কর্মকর্তার বিচার করে ১৩ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল। কিন্তু মোজাফফরের মতো মূল চরিত্ররা ধরা না পড়ায় সেই তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে সবসময়ই নানা প্রশ্ন ছিল।

দীর্ঘ ৪৫ বছর পর আজ যখন এই বৃদ্ধ সেনা কর্মকর্তা মিলিটারি পুলিশের হেফাজতে, তখন দেশের আপামর জনতার মনে উঁকি দিচ্ছে একগুচ্ছ প্রশ্ন। মোজাফফরের মুখ থেকে কি বের হয়ে আসবে সেই ঐতিহাসিক সত্য? জিয়ার সেই হারিয়ে যাওয়া ডায়েরি ও গোপন কাগজপত্রের হদিস কি মিলবে? নাকি সত্তরোর্ধ্ব এই সাবেক সেনা কর্মকর্তার নীরবতার সাথেই চিরতরে দাফন হয়ে যাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত এক অধ্যায়ের নেপথ্য সত্য? আগামী দিনগুলোর আইনি প্রক্রিয়াই হয়তো দেবে এই সব প্রশ্নের উত্তর।