যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন নিজেই একের পর এক আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার রেকর্ড গড়েছেন, তখন তাঁর সেই ‘খেয়ালি’ নিয়মের ফাঁদেই এবার তাঁকে বন্দি করেছে তেহরান। সম্প্রতি চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে ইরানের কড়া সমালোচনা করেন ট্রাম্প। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন ট্রাম্পেরই তৈরি করা খেলায় মেতেছে এবং এই লড়াইয়ের গতিপ্রকৃতি শেষ পর্যন্ত তেহরানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, "এটি (যুদ্ধ বিরতির সমঝোতা স্মারক) একটি চূড়ান্ত চুক্তি ছিল, কিন্তু তারা তা ভেঙেছে। তারা সবসময়ই চুক্তি ভঙ্গ করে।" তবে সমালোচকরা বলছেন, ওবামা আমলের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তিটি ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে একতরফাভাবে বাতিল না করলে ওয়াশিংটনকে আজ এই গভীর সংকটে পড়তে হতো না।
প্রণালির ‘টোল’ বা মাশুল যুদ্ধ এবং তেহরানের খোঁচা
হরমুজ প্রণালিতে নতুন উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে ট্রাম্প যখন এই পথ অতিক্রমকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ২০ শতাংশ নিজস্ব মাশুল বা ‘ইউএস রিইমবার্সমেন্ট ফি’ আরোপের ঘোষণা দেন, তখন তেহরান অত্যন্ত চতুর ও ব্যঙ্গাত্মক উপায়ে এর জবাব দেয়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্সে (সাবেক টুইটার) ট্রাম্পকে খোঁচা দিয়ে লেখেন:
"ট্রাম্প একদম ঠিক বলেছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে যাতায়াতের জন্য মাশুল নেওয়ার বিষয়ে আমাদের (তেহরানের) অবস্থানকে তিনি নিজেই বৈধতা দিলেন। তবে ২০ শতাংশ মাশুল একটু বেশিই হয়ে যায়; আমরা ন্যায্য আচরণ করব।"
ব্যবসায়ী আলোচক দলের অদূরদর্শিতা ও চুক্তির ফাঁক
বিশ্লেষকদের মতে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে ট্রাম্পের আবাসন ব্যবসায়ী আলোচক দলটি যে তড়িঘড়ি করে একটি অস্পষ্ট ভাষার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল, ইরান এখন ঠিক সেই ফাঁকফোকরগুলোকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
চুক্তিতে ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচলের নিশ্চয়তার পাশাপাশি এর ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক পরিষেবা ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ওপরে ওপরে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য মনে হলেও, ইরান এটিকে স্থায়ীভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর তাদের সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আইনি স্বীকৃতি হিসেবে দেখছে। আর এ কারণেই মাত্র কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে পুরো প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতাকে বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট করে দিয়েছে তারা।
অচলাবস্থার মুখে ট্রাম্প: সমাধান কোন পথে?
বর্তমান সংকটের মূল ক্ষেত্রসমূহমার্কিন বাস্তবতা ও ঝুঁকিখারগ দ্বীপে হামলার শঙ্কাইরানের প্রধান তেল উৎপাদন কেন্দ্রে বড় ধরনের হামলা হলে মার্কিন সেনাদের ব্যাপক হতাহতের ঝুঁকি রয়েছে, যা ট্রাম্প এড়াতে চান।অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতিদ্রুত বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক ক্ষতি ও জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা মার্কিন প্রশাসনের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়াচ্ছে।কূটনীতির সুড়ঙ্গপথপুরোপুরি যুদ্ধের চেয়ে দুই পক্ষই এখন সমঝোতা স্মারকের নিজস্ব ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করতে ‘ধিকিধিকি’ সংঘাতের মাধ্যমে কূটনীতির দর কষাকষি করছে।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ সিএনএনকে বলেন, "উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেও কূটনীতির সুযোগ রয়েছে। তবে প্রতিদিনের এই সংঘাত পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।"
যে যুদ্ধকে ট্রাম্প "ইতিমধ্যেই জিতে গেছেন" বলে বারবার দাবি করেছিলেন, সেই যুদ্ধের চোরাবালিতেই এখন আটকে গেছেন তিনি। বিশ্ববাসী এখন গভীর আগ্রহে চেয়ে আছে—অস্ত্র এবং হুমকির ঊর্ধ্বে উঠে ট্রাম্প কীভাবে এই কূটনৈতিক গোলকধাঁধা থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসেন।