প্রতিবন্ধকতা যে মানুষের আকাশছোঁয়া স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারে না, তার এক উজ্জ্বল ও জীবন্ত উদাহরণ কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার তরুণ মো. তানিম ইসলাম। জন্মগত শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, কেবল অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর বুকভরা আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে শিক্ষার আলোয় নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে এক নিরলস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এই এইচএসসি পরীক্ষার্থী।
চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় চিলমারী মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্র থেকে মানবিক বিভাগে অংশ নিচ্ছেন তানিম। প্রতিটি পরীক্ষার দিন তাঁর কাছে এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্রের মতো, আর সেই যুদ্ধে তাঁর প্রধান হাতিয়ার—দৃঢ় মনোবল এবং পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন।
দ্বীপগ্রাম থেকে উঠে আসা এক লড়াকু সৈনিক
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার প্রত্যন্ত ডাওয়াইটারি দ্বীপগ্রামে তানিমের বাড়ি। তাঁর বাবা মোহাম্মদ মিলন কাসেম একটি ড্রাইসেলস কোম্পানির সানলাইট ফ্যাক্টরিতে কর্মরত এবং মা মোছা. মাহমুদা বেগম একজন গৃহিণী। ২০০৭ সালে জন্ম নেওয়া তানিমের শারীরিক গঠন আর দশটা সাধারণ শিশুর মতো ছিল না। তাঁর ডান হাতটি কনুই পর্যন্ত এবং বাম হাতে কেবল বৃদ্ধাঙ্গুলি ছাড়া বাকি কোনো আঙুল নেই। এমনকি তাঁর কথাও কিছুটা অস্পষ্ট।
কিন্তু এই কঠোর বাস্তবতা কখনোই তানিম বা তাঁর পরিবারকে দমাতে পারেনি। মা-বাবা শুরু থেকেই তাঁকে সমাজের আর দশজন সুস্থ মানুষের মতোই স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন।
বিজ্ঞান থেকে মানবিক: সাফল্যের গ্রাফ
শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেই তানিম রাধাবল্লভ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৪.১৭ অর্জন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি চিলমারী সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন।
পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রের ৪ নম্বর কক্ষে বসে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে পরীক্ষা দিচ্ছেন তানিম। পরীক্ষা শেষে তাঁর সহপাঠী ও শিক্ষকেরা জানান, তানিম অত্যন্ত অধ্যবসায়ী ও আত্মপ্রত্যয়ী। শারীরিক সীমাবদ্ধতা কোনোদিন তাঁর ক্লাসের পড়া বা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমাতে পারেনি, উল্টো তাঁর এই সংগ্রামী জীবন অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা জোগায়।
"নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই"
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তানিম দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “জীবনে অনেক বাধা এসেছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সততা ও চেষ্টা থাকলে কোনো বাধাই মানুষের পথ আটকে রাখতে পারে না। তাই যত কষ্টই হোক না কেন, আমি আমার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সমাজের জন্য কিছু করতে চাই।”
ছেলের এই লড়াই নিয়ে আবেগাপ্লুত মা মাহমুদা বেগম বলেন, “তানিম আমাদের দুই সন্তানের মধ্যে বড়। জন্ম থেকেই সে শারীরিক প্রতিবন্ধী। অনেক চিকিৎসাও করিয়েছি, কিন্তু তেমন উন্নতি হয়নি। তারপরও আমরা তাকে কখনো অবহেলা করিনি। আমরা চাই সে যেন শিক্ষিত হয়ে নিজের যোগ্যতায় সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।”
চিলমারী মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রের কেন্দ্রসচিব জিতেন্দ্র নাথ বর্মণ তানিমের এই অদম্য যাত্রাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, “তানিমের মতো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য যদি আরও সহায়ক পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবে তারা নিজেদের মেধা ও সক্ষমতার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটাতে পারবে। এদের এই অভাবনীয় সাফল্য সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে বড় ভূমিকা রাখবে।”