১২ জুলাই, ২০২৬

ম্যাচসেরার পুরস্কার যখন শুধুই ‘জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা’

ম্যাচসেরার পুরস্কার যখন শুধুই ‘জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা’

বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কাটার পর ম্যাচসেরার পুরস্কারটি যখন হাতে নিলেন লামিনে ইয়ামাল, তাঁর চোখেমুখে খুব একটা উচ্ছ্বাস দেখা গেল না। ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের সামনে তাঁর শরীরী ভাষায় মিশে ছিল একরাশ উদাসীনতা, যা কিছুদিন আগে অস্ট্রিয়া ম্যাচের পরও দেখা গিয়েছিল।

প্রায় একই রকম অনীহা দেখা গেছে বসনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে সেরা হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মালিক টিলমানের ক্ষেত্রেও। পুরস্কার হাতে ক্যামেরার দিকে তাকাতেও যেন তাঁর অদ্ভুত এক অস্বস্তি! যেন মনে মনে জানেন, এই ট্রফির জন্য মাঠে তাঁর চেয়েও বেশি যোগ্য কেউ ছিলেন। কিন্তু মাঠের সেরা পারফরমারকে বেছে নেওয়ার এই আনুষ্ঠানিকতা কেন খোদ ফুটবলারদের কাছেই এখন এতটা ফিকে, এতটা অর্থহীন?

ইতিহাস ও নিয়মের বিবর্তন
২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে ফিফা প্রথম চালু করেছিল ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার। ২০২২ সালে লিঙ্গনিরপেক্ষতা বজায় রাখতে এর নাম বদলে করা হয় ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’। শুরুর প্রথম দুটি সংস্করণে (২০০২ ও ২০০৬) মাঠের সেরা বেছে নেওয়ার দায়িত্ব ছিল ফিফার ‘টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ’-এর প্রথিতযশা বোদ্ধাদের হাতে। সেখানে আবেগ বা জনপ্রিয়তার চেয়ে ফুটবলের ব্যাকরণই ছিল শেষ কথা।

কিন্তু ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ থেকে ফিফা এই বিচারের ভার তুলে দেয় গ্যালারি আর ড্রয়িংরুমের আমজনতার হাতে। মুঠোফোন এসএমএস, অনলাইন এবং কাতার বিশ্বকাপ থেকে ফিফার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে শুরু হয় ভোটযুদ্ধ। খেলার প্রথমার্ধ থেকে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত যেকোনো সমর্থক যেকোনো খেলোয়াড়কে ভোট দিতে পারেন, এমনকি শেষ মুহূর্তে ভোট বদলে নেওয়ার সুযোগও থাকে।

জনতার রায় বনাম পণ্ডিতের বিচার
আর এখানেই তৈরি হয়েছে এক চরম বৈপরীত্য। পরিসংখ্যান আর পারফরম্যান্সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই পুরস্কার এখন রূপ নিয়েছে এক নিছক ‘জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায়’। যেখানে পারফরম্যান্সের চেয়ে খেলোয়াড়ের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’রই বেশি কদর। ২০২২ বিশ্বকাপে কানাডার বিপক্ষে ১-০ গোলে জেতার পর খোদ বেলজিয়াম তারকা কেভিন ডি ব্রুইনা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, “আমি মনে করি না আমি কোনো দুর্দান্ত ম্যাচ খেলেছি। কেন এই ট্রফি পেলাম জানি না। হয়তো আমার নামের কারণে!”

চলতি বিশ্বকাপেও মহাতারকাদের জয়রথ
চলমান বিশ্বকাপেও সেই একই নাটকের পুনরাবৃত্তি ঘটছে বারবার। শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ের ম্যাচে ৪১ বছর বয়সী মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ৬৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করা ছাড়া পুরো ম্যাচে প্রায় অদৃশ্যই ছিলেন, অথচ ম্যাচসেরার পুরস্কার উঠেছে তাঁর হাতেই!

একই চিত্র দেখা গেছে আর্জেন্টিনার ম্যাচেও। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৩-২ গোলের শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের ম্যাচে লিওনেল মেসিকে দেওয়া হয় এই পুরস্কার। মেসি প্রথম গোলটি করলেও লিসান্দ্রো মার্তিনেজ নিজে গোল করেছিলেন এবং মেসির গোলেও অ্যাসিস্ট করেছিলেন। এমনকি কেপ ভার্দের সিডনি কাবরালের অবিস্মরণীয় লড়াইও ঢাকা পড়ে গেল মেসির জনপ্রিয়তার আলোয়। আবার ঘানার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে জুড বেলিংহাম যখন ম্যাচসেরা হন, তখন আফ্রিকান দলটির রক্ষণভাগের অসামান্য লড়াই কোনো স্বীকৃতিই পায়নি।

তা সত্ত্বেও মহাতারকাদের এই জয়রথ কিন্তু থামেনি। চলমান বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার এই পুরস্কার জেতার রেকর্ডে সবার ওপরে আছেন লিওনেল মেসি। নিজের খেলা প্রথম ৫ ম্যাচের মধ্যে ৪টিতেই তিনি হয়েছেন ম্যাচসেরা। ৩টি করে ট্রফি নিয়ে মেসির পেছনেই আছেন জুড বেলিংহাম, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও আর্লিং হলান্ড। আর বিশ্বকাপের সামগ্রিক ইতিহাসে তো মেসি সব হিসাবের বাইরে, সর্বোচ্চ ১৫ বার এই ট্রফি উঠেছে তাঁর হাতে। পারফরম্যান্সের চেয়ে যখন ‘নাম’ বড় হয়ে ওঠে, তখন ট্রফিগুলো যে তার মাহাত্ম্য হারাবে—তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।