৯ জুলাই, ২০২৬

সংবিধানে ফিরল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট

সংবিধানে ফিরল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট

দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে যোগ হলো এক নতুন অধ্যায়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহালসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনীর রায়ের বিরুদ্ধে করা পৃথক ৩টি আপিলই খারিজ করে দেন। এর ফলে দীর্ঘ দেড় দশক পর সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসার পথ সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত হলো।

রায়ের পরপরই সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, “আপিল বিভাগ আপিলগুলো খারিজ করে দেওয়ায় হাইকোর্টের রায়টিই চূড়ান্তভাবে বহাল থাকল। এর ফলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং গণভোটের বিধান সংবিধানে ফিরে এল।”

রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়া: আইনি ব্যাখ্যা
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির রায়ের তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যায় বলেন, “হাইকোর্ট বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনীর যে চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে তা অসাংবিধানিকই থাকল। প্রথমত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরতে আর কোনো বাধা নেই। দ্বিতীয়ত, সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনঃপ্রবর্তিত হলো।”

তিনি আরও জানান, নিম্ন আদালতকে রিট করার ক্ষমতা দেওয়া সংবিধানে অনুচ্ছেদ ৪৪(২) এবং সংবিধানের কিছু অংশকে অপরিবর্তনীয় ঘোষণা করা ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ দুটিও অসাংবিধানিক ও বাতিল থাকবে। তবে সংবিধানের প্রস্তাবনা, ধর্মনিরপেক্ষতা বা জাতীয় চার মূলনীতির মতো রাষ্ট্রীয় পলিসির বাকি বিষয়গুলোর সিদ্ধান্তের ভার পরিপূর্ণভাবে জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের ইতি
২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে সংবিধানে ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন এনেছিল, যার অন্যতম ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়।

চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিল ঘোষণা করেন। গত বছর (২০২৫ সাল) ৮ জুলাই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার বিশিষ্ট ব্যক্তি, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন পৃথক ৩টি আপিল দায়ের করেন। চলতি সপ্তাহে ৩ দিনব্যাপী দীর্ঘ শুনানি শেষে আজ সর্বোচ্চ আদালত এই চূড়ান্ত রায় দিলেন।

মামলায় সুজন সম্পাদকের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া এবং রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেলসহ অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অনীক আর হক শুনানিতে অংশ নেন। ইন্টারভেনার হিসেবে যুক্ত ছিল গণফোরামও।

আইনজীবীরা মনে করছেন, এই রায়ের মাধ্যমে দেশের রাজনীতি ও আগামী নির্বাচনের রূপরেখায় এক বিশাল গুণগত পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে, যা জাতীয় সংসদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে।